Monday, 8 June 2015

কিসসা কাউন্টার কা


কাউন্টারের ওপারের লোকজন কি সবসময় এরকম গোমরামুখো শয়তান টাইপের হয়? সবসময় কাজ না করার ইচ্ছে নিয়ে , ওপর দিকের গ্রাহকদের মানুষ বলে না মনে করার মনোভাব নিয়ে বসে থাকে? যেন সর্বক্ষণ ভাবে থাকে দয়া-ভিক্ষা-দাক্ষিণ্য বিতরণ করছে! সত্যি বলতে কি আমি ভালোমানুষ, সহাস্য, সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে কাউন্টারের ওপারে কোনো মানুষকে আজ পর্যন্ত বসতে দেখিনি।  ভালো মানুষ যদি দু একজন পেয়েও থাকি তবে তা এতই নগন্য যে এই মুহুর্তে  কারও মুখ মনে করতে পারছি না।  আপনি দেখবেন, ব্যাঙ্ক বলুন কিম্বা টিকিট কাউন্টার, সরকারি অফিস বলুন বা প্রাইভেট, কোনও কাউন্টারের ওপারে ভালোমানুষ-মুখ দেখতে পাবেন না।  কাজ করতে কী বিরক্তি! তবে কাজ করছিস কেন রে বাবা!

এমন ভাববেন না যে আমি এমনি এমনি এরকম গালাগাল দিচ্ছি।  প্রমান সহযোগে বলতে পারি এ অভিজ্ঞতা আমাদের সবার।  কম বেশি।  ধরুন সরকারি ব্যাঙ্ক, মানে স্টেট ব্যাঙ্ক ট্যান্ক আর কি।  আমি তো পণ করেই ফেলেছি, ওই স্টেট ব্যাঙ্ক এ কখনও একাউন্ট করব না।  বাপ রে বাপ।  কাউন্টারের সামনে তিরিশ জনের লাইন।  কাউন্টারের ওপারের ক্লার্ক মশাই হঠাত উঠে দাঁড়ালেন।  আমাকে এখন খেতে যেতে হবে।  বেশ, খিদে পেয়েছে, তা যান।  কিন্তু কোথাও তো লিখে রাখেননি যে দুপুর ২:৪০ মিনিটে আপনি মধ্যাহ্নভোজ সারতে যাবেন।  আচ্ছা তাও না হয় গেলেন।  কিন্তু আপনার বিকল্প কাউকে বসিয়ে যান।  এই তিরিশ জন গ্রাহক যে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবেন, তাদের কথা একবারও ভাববেন না! প্রতিবাদের কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই ক্লার্ক বাবু উঠতে একটু ইতস্তত করছিলেন।  ওমা! পাশের কাউন্টার থেকে সই করতে ব্যস্ত থাকা ব্যাঙ্ক-এরই  এক মাতব্বর নির্দেশ দিয়ে দিলেন, "আরে যা না।  খিদে পেলে খাবি না? যা যা।  একটু ওয়েট তো করতে হবে দাদা। " অভয়বাণী শোনা মাত্রই বাবু উঠে গেলেন  নিঃশব্দে।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে থাকলেন গ্রাহকরা।  আর মাতব্বর বাবু এক মনে অন্য একটা কাউন্টারে বসেই সই করে যেতে থাকলেন।  সামনে পুরো ফাঁকা।  সেই দেখে একজন অধৈর্য গ্রাহক বলেই ফেললেন, "দাদা আপনি নিয়ে নিন না ডিপোজিট গুলো।" বাবু পাত্তাই দিলেন না।  একজন খালি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন।  কয়েকবারের বৃথা চেষ্টার পরে, বাবু মুখ তুলে তাকিয়ে কৃতার্থ করলেন প্রজাদের, থুড়ি গ্রাহকদের।  ঠান্ডা গলায় বললেন, "ওটা আমার কাজ নয়।  একটু দাঁড়ান।  উনি চলে আসবেন।" উনি যে আবার খাওয়া দাওয়া করে আবার কখন মর্ত্যে অবতীর্ণ হবেন কেউ জানে না।  অগত্যা আবার দীর্ঘশ্বাস।  এর মধ্যে কেউ একজন মাথা গরম করে দু চার কথা শুনিয়েও দিলেন 'মাতব্বর বাবুকে' আর পাল্টা তির ছুটে আসলো কাউন্টারের পিছন থেকে।  নীট ফল আবার দীর্ঘশ্বাস।  

অন্য এক সরকারী ব্যাঙ্ক, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার  এক কর্মী একটি অফিসে নতুন একাউন্ট খোলার জন্য ফর্ম ভরাতে গিয়েছিলন।  জীবনে প্রথমবার। এই 'গ্রাহক-সেবার' কাজে এভাবে নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে তিনি যার পর নাই গর্বিত বোধ করছিলেন।  সে গর্বের যা সাইড এফেক্ট হলো, সে আর বলার নয়।  যে কাজ বেসরকারী ব্যাঙ্ক-এর কর্মীরা রাতদিন করে চলেছেন, সেই কাজ তিনি করে, ক্লান্ত হয়ে সেই অফিস থেকে ব্যাঙ্ক এ ফিরে এলেন।  এবার চেক বই আনতে গিয়ে, সেই কর্মীরই মুখোমুখি হতে হলো ব্যাঙ্ক-এর কাউন্টারে।  তিনি তো সেই অফিসের কর্মীদের দেখে বিগলিত।  বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের দেখে।  কাউন্টারে বসে তিনি নিজের কত কষ্ট হয়েছে, কতটা ঘাম কপাল থেকে পায়ের পাতায় পড়েছে সেসব খতিয়ান দিতে থাকলেন। আর সেই মহিলার পিছনে তখন আরও জনা দশেক গ্রাহক।  অবশেষে যখন সেই মহিলার এক পুরুষ সহকর্মী কাউন্টারের সামনে পৌছালেন, ততক্ষণে ব্যাঙ্ক-এর বাবু আবার ক্লান্ত হয়ে গেছেন।  নিজের আসনে বসেই তিনি এটা সেটা করতে থাকলেন।  দু'তিনবার পাশের কাউন্টারের ক্লান্ত সহযোদ্ধার সঙ্গে বাক্য বিনিময় করলেন।  কাউন্টারে যে একজন দাঁড়িয়ে আছেন সেটা বেমালুম ভুলেই গেলেন মনে হলো।  চেক বই অবশ্য পাওয়া গেল কিছুক্ষণ পরে আর তারপর সেই গ্রাহকের কাছ থেকে এমন ঝাড় খেলেন যে তাতে ব্যাঙ্ক-বাবু মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন।  তার মাথা আর কাজ করতে চাইল না সেই ঝগড়ার পরে।  পরের অপেক্ষমান গ্রাহকদের কপালে অশেষ দুঃখ লেখা ছিল সে আর না বললেই নয়।  

আজ নামী এক বই-বিপনীর কাউন্টারে একজন কর্মীর মুখোমুখি হলাম।  ভিড় ঠেলে কোনরকমে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেও, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলাম।  নিজের দাদাকেও এতবার ডাকতে হয়নি, যতবার ওনাকে ডাকলাম, একবার চোখ ফিরে তাকাবার জন্য।  তাকালেন বটে।  কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।  কি করে পারেন কে জানে! বইয়ের একটা লিস্টি তার হাতে তুলে দেবার চেষ্টা করলাম। হাতে নিলেন না।  আমি তুলে ধরে রইলাম, উনি দূর থেকে পড়ার চেষ্টা করতে থাকলেন। বইগুলো আছে কি নেই, জানানোর আগেই তিনি অন্য এক কাস্টমার দেখে তার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন।  তার চাহিদা পূরণের আগেই আবার পিছন ফিরে কাকে কি একটা নির্দেশ দিলেন।  বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলতে থাকার পর আবার ফিরে এলেন আমার দৃষ্টি-কোণে।  এবার হাতে নিলেন বইয়ের তালিকাটি।  কিছু না বলেই এবাউট টার্ন নিয়ে চলে গেলেন বিপনীর ভিতরে বইয়ের সন্ধানে।  অনেক কাঠখর পুড়িয়ে পাঁচটি বইয়ের মধ্যে দুটো জুটল।  অন্য গুলো পরে পাওয়া যাবে কি যাবে না সে উত্তর আদায় করতে পারলাম না।  কাউন্টারের এপারে দাঁড়িয়ে যা পেয়েছি তাই যথেষ্ট ভেবে চলে আসলাম।  

এরকম অভিজ্ঞতা ভুরি ভুরি আছে।  "এখন হবে না পরে আসুন।" বা "এটা  না আনলে তো ওটা হবে না" ইত্যাদি তো আমাদের শোনা কমন লাইন। বাকি গল্পগুলো পরে একদিন হবে।    

(সঙ্গের ছবিটির সত্যি না মিথ্যে জানি না।  তবে নেট-দুনিয়ার বহুল প্রকাশিত ছবি। এটা যদি সত্যিও হয়, অবাক হব না।)

Sunday, 7 June 2015

সিরিয়াল বিভ্রাট


আচ্ছা এই ভুরিওয়ালা একটা ছেলেকে দেখে লোকের কী করে মনে হয় যে এ টিভি সিরিয়ালের অভিনেতা! কী বিপদ! সেদিন দুপুরবেলা। ছুটির দিন।  বেড়িয়েছি বাড়ি থেকে।  একটু এগোতেই আচমকা এক বয়স্ক ভদ্রলোকের গলা পেয়ে দাঁড়াতে হলো।  
"এই যে। এই তো পেয়েছি।  দাঁড়াও দাঁড়াও।"
আমি হতবাক।  এই ভর দুপুরে ছেলেধরার মত করে এই বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন কেন? আমাকেই বলছেন তো? পিছন ফিরে দেখেও নিলাম একবার।  না আর তো কেউ নেই।  
-- "তোমাকেই বলছি।  দাঁড়াও দাঁড়াও।  এই যে দেখছ।" এই বলে দেখি খানিকটা পিছনে এক বৃদ্ধাকে ডাকছেন।  বয়সের ভারে ভদ্রমহিলা একটু পিছনে পড়ে গেছেন।  আমি ভাবলাম, হয়ত কোনো ঠিকানা জানতে চাইবেন। এ পাড়ায়  আগে ওনাকে কখনো দেখিনি।  আমি বিনীত ভাবে বললাম, "হ্যা, বলুন।.."
-তুমিই তো সিরিয়াল কর।  তাই না? কি যেন চলছে এখন ষ্টার জলসায়। ...
 আমি তো থ! "না আমি নই।  আপনার বোধহয় ভুল হচ্ছে।  অন্য কাউকে ভাবছেন।" আমি স্মিত হেসে বলি।  এক  পা এগোই।  যাবার জন্য।  
---"না না বাবা।  আমি ঠিক চিনেছি।  ওগো দেখছ, এই সেই ছেলেটি না? কি যেন নাম সিরিয়ালটার।.." গিন্নিকে ডেকে চেনাবার চেষ্টা করেন আর চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকেন সিরিয়ালটার নাম।  
আমি আবার বলি, "আপনি অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন আমায়।"
এবার আরও বড় গোলা।  "আরে আমি জানি তোমরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে দিতে চাও না।  কিন্তু আমি ঠিক ধরেছি।  আরে কি আছে! আমরা তো বুড়ো-বুড়ি।  আমাদের কাছে আর কি আছে..."
ভদ্রমহিলাও আমাদের কাছে চলে এসেছেন।  চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছেন।  চশমার ভিতর থেকে দুটো চোখ আমাকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।  স্মৃতির সঙ্গে।  আমি বুঝতে পারছি বিপদ ঘনাচ্ছে।  আমি আবারও বাঁচার একটা চেষ্টা করি। ভাবি টিভিতে দেখে নিউজ চ্যানেলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। সচারচর অপরিচিত লোকজনকে কাজের প্রয়োজন ছাড়া নিজের আসল পরিচয় চট করে দিই না।  তাহলেই লোকে গুটিয়ে নেয় নিজেকে।  কিন্তু এখানে 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা'।
--"আমি সাংবাদিক।  আমি অভিনয় করি না। "
--"আরে আমাদের কাছে লুকোনোর কি আছে? তোমাদের অভিনয় আমাদের খুব ভালো লাগে। যাক গে, তা এখন কি শুটিং এ যাচ্ছ নাকি?"
ভদ্রলোকের ভাব জমানোর চেষ্টায় আমি তো প্রায় কুপোকাত।  এগোতেই পারছি না।  এগোতে দিচ্ছেনও না।  অভদ্রতাও করতে পারছি না।  যে বলব ধুর মশাই, পাগলামো থামান তো।  কার সঙ্গে কাকে মেলাতে চাইছেন! আমার মেলা কাজ আছে।  আমাকে ছাড়ুন।  
উনি বলে চলেছেন, " তা তুমি এদিকেই থাকো? নাকি এপাড়ায় কারো বাড়িতে এসেছিলে? আমাদের বাড়ি এ পাড়ায়।  ওই যে।"  হাত তুলে দেখালেন। 
 আমিও বললাম, "আমি এখানেই কাছে ভাড়া থাকি একটা ফ্ল্যাটে।"
--"তাই নাকি! ও বাবা আমি তো জানতামই না যে এ পাড়ায়  একজন অভিনেতা থাকে।  কয়েকজন হিরোইনকে অবশ্য আসতে দেখেছি ওই পাশের বিল্ডিং-এ।  আর তুমি এখানেই থাক।  আর আমি এতদিনেও জানি না।  কি কান্ড।"
আমার তখন কান্ড-জ্ঞান যেতে বসেছে।  আর ভুল ভাঙ্গানোর কোনো চেষ্টা করা বৃথা বুঝে কোনরকমে কেটে পড়ার তালে আছি।  কোনরকমে ব্যস্ততা দেখিয়ে বললাম, "আমার আসলে দেরী হয়ে যাচ্ছে।  আমি আসি।"
--"নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।  এস এস।  তোমার আবার শুটিং এর দেরী হয়ে যাচ্ছে।  তা কোথায় শুটিং আজ? টালিগঞ্জেই? তুমি তো এপাড়াতেই থাকো। একদিন এস আমাদের বাড়িতে।  আমরা বুড়ো-বুড়ি মিলে  থাকি।  তোমাদের সিরিয়াল দেখেই আমাদের সময় কেটে যায়।"
মনে মনে ভাবি, কি দরকার এসব পচা সিরিয়াল দেখার।  কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে এগোই।  ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাকে আবার আমার করুণ হাসি উপহার দিয়ে। 

.........

আমাকে আমার বন্ধুস্থানীয় এক পরিচালক একবার একটা সিরিয়াল এ অভিনয় করার সুযোগ দেবে বলেছিল।  সে নিজেও তখন সুযোগ খুঁজছিল।  সে যখন কয়েক বছর বাদে সুযোগ পেল, আমাকে বলল আমার চেহারায় নাকি আর সিরিয়াল হয় না।  আমি যে খুব জুলুজুলু নয়নে সিরিয়াল করব বলে অপেক্ষা করছিলাম, তা নয়।  কিন্তু চেহারার খোঁটায় একটু আহত তো হয়েইছিলাম।  যতই বিড়ম্বনায় পড়ি না কেন, পরে মনে মনে ভেবেছি আর হেসেছি যে, এই বৃদ্ধ দম্পতির আশীর্বাদে ক্ষতে একটু আরামের প্রলেপ লেগেছিল বৈ কি।  

(সঙ্গে ষ্টার জলসার আমার খুব প্রিয় একটি সিরিয়াল এর ছবি।  ছবি সৌজন্য: ষ্টার জলসা)

Saturday, 6 June 2015

খিচুড়ি-কথা

সহজ কথায় চালে ডালে। সুস্বাদু থেকে সুস্বাদুতর করার জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর রেসিপি নিশ্চয়ই আছে।  কিন্তু সহজ হোক বা কঠিন, আমার কাছে ব্যাপারটা সুস্বাদুতমই। স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এ খাদ্যবস্তুর গ্রহণযোগ্যতা আমার কাছে প্রশ্নাতীত। সুতরাং লক্ষী পুজো বা সরস্বতী, মনসা বা গনেশ, শনি বা লোকনাথ, ধর্ম কর্মে মন না থাকলেও, পাত পাড়তে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।  শুধুমাত্র ভোগের মেনুতে খিচুড়ি থাকলেই এ বান্দা হাজির। খিচুড়ি জিন্দাবাদ।  

পুজোর ভোগের নেমন্তন্ন থেকে যে আমার খিচুড়ি প্রীতি জন্মেছে, এমনটা নয়।  বঙ্গ গৃহস্থের ঘরে বর্ষা বা বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাদল বরষে তো খিচুড়ি পাতে। অন্ততঃ ছোটবেলা থেকে বৃষ্টি হলেই মা'র কাছে খিচুড়ির বায়না ছিল অবধারিত।  তারপর, আলু ফুলকপি সহযোগে, ঘি, বেগুন ভাজা, ডিম ভাজা, পাঁপড় আর ভাগ্য ভালো থাকলে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে জমিয়ে ঘন খিচুড়ি।  আহা! শীতকালের রাত্রিরেও খিচুড়িরব্যাপারটা  থেকে ভালো মেনু আর কিছু ছিল না।  মা আবার মশলাপাতি না থাকলে, ঠিক ডাল না থাকলে, খিচুড়ি রান্না করতে চাইত না। কিন্তু তখন মনে হত মশলাপাতি কি দরকার! চালে ডালেই তো খিচুড়ি হয়ে যায়।  নিজে কখনও রাঁধিনি, তাই রাঁধুনির চোখ দিয়ে কখনও খিচুড়ির কথা ভাবিনি।  আমার সবই চলে।  এখনও চলে। 

বাসি খিচুডির স্বাদ অনবদ্য।  তাই শুধু রাতে নয়, কিছুটা রেখে সকালবেলা ব্রেকফাস্ট খিচুড়ি দিয়ে সেরে নেয়ার বন্দোবস্ত করে রাখা হত।  ব্রেকফাস্ট এ খিচুড়ি! শুনে অনেকেই নাক সিঁটকোতেন।  বিশেষ করে আমার নরেন্দ্রপুরের অনেক বন্ধুই।  কিন্তু শুক্রবার রাতে ভবনের খাবারের মত রবিবার সকালের জলখাবারের দিকেও আমার মন পড়ে থাকত।  কে শুরু করেছিলেন ঠিক জানি না।  যাঁরাই করে থাকুন তাঁদের আমার অন্তরের ধন্যবাদ।  ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টায় রবিবার সকালের মেনু ছিল খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজা।  অমৃতের মত তারিয়ে তাড়িয়ে খেতাম।  অনেকেই খেত না বলে বোধহয় ভাগেও বেশি পেতাম।  বাসি আর নরেন্দ্রপুরের খিচুড়ি আমার বড় প্রিয়।  তবে পুজোর ভোগের মত খিচুড়ির স্বাদ আর বোধহয় কিছুতেই নেই।  লক্ষী পুজোর নেমন্তন্ন পাওয়ার জন্য ছটফট করতাম। শুধু ওই ভোগের খিচুড়ি খাব বলে।  আমার ব্যক্তিগত ধারণা পূর্ববঙ্গীয় মানুষেরা খিচুড়ি ভোগ ভালো রাঁধেন।  বেশ জমাট বাঁধা।  সঙ্গে লাবড়ার সঙ্গত।  লিখতে লিখতেই জিভে জল চলে আসছে।  মা লক্ষী আমাকে নিজগুনে ক্ষমা করে ঠিক খিচুড়ি জুটিয়ে দেন ফি বছর।  

তবে অনেক পরে জেনেছি, পেটের পক্ষে খিচুড়ি পথ্য হিসেবে কাজ করে।  ফাইভ ষ্টার হোটেলে বসে দেশের এক বড় রাজনীতিককে দই দিয়ে খিচুড়ি খেতে দেখে বেশ অবাকই হয়ে ছিলাম। তবে শরীর সুস্থ থাকবে এই অছিলায় আমিও আজকাল নিয়মিত খিচুড়ি খাই। "করতে গেলাম ভাত আর হয়ে গেল খিচুড়ি" - এই গল্পও আমাকে ফুটপাথের খিচুড়ি খাওয়া থেকে থামাতে পারে নি।  (এক বিধবা মহিলা গঙ্গা স্নান করে এক ঘটি গঙ্গা জল নিয়ে এসে একটু চাল দিয়ে সেই ঘটিতেই ভাত বসিয়েছিলেন।  ওমা।  যখন ভাত নামাতে যাবেন, দেখেন একি এতো হলুদ খিচুড়ি হয়েছে! পরে বুঝেছিলেন, গঙ্গা জল তোলার  সময় জলের সঙ্গে  মনুষ্য বিষ্ঠাও তুলে এনেছিলেন। তাই ভাত হলো খিচুড়ি )

দিন দিন আমার খিচুড়ি-পাগলামো যেন বেড়েই চলেছে। যেখানে পাই সেখানেই খাই।  আত্মীয়-স্বজনরাও জেনে গেছে। গেলেই খিচুড়ির লোভ দেখিয়ে আটকে দেয়।  কাজের ব্যস্ততায় পুজোর নেমন্তন্ন রক্ষা না করতে পারলেও, বাড়ি বয়ে খিচুড়ি ভোগ দিয়ে যায়।  খিচুড়ি রান্না হলে আগাম নিমন্ত্রণ চলে আসে।  আর আমিও তেমন। রাত বারোটায় একবার এক শনি মন্দিরের সামনে হাজির হয়েছিলাম। খবর ছিল, ভোগ বিতরণ হচ্ছে।  একসময় যে খাবার বিলাসিতার জন্য রসিয়ে বানাত মা, আজকাল আমরা নবীন দম্পতি তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর থাকলে বা বাড়িতে কোনো খাবার না থাকলে একটু চালে ডালে বসিয়ে নিয়ে থাকি।  

একবারই আমি খিচুড়ি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম।  হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, "আমাদের এখানে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।  আপনারা চলে আসুন।" উঁকি মেরে দেখে নিয়েছিলাম, খাওয়া মানে খিচুড়ি।  প্রচুর বাচ্চা, মহিলা, পুরুষদের সঙ্গে আমিও হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেই ঘোষণাস্থলের উদ্দ্যেশে।  অন্যদের হাতে বাটি, থালা, পেটে খুব খিদে, চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যত।  পাকা রাস্তার দুধারে খোলা আকাশের নিচে শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে ওদের অবস্থান।  আর দূর দুরান্তে যেদিকে চোখ যায়, শুধু জল আর জল।  টালির বাড়ির মাথাটুকু দেখা যাচ্ছে বা নারকেল গাছের আগা।  পাকা রাস্তা থেকে আজ সকালেই জল নেমেছে।  সেখানেই উঠে এসেছে বন্যা বিধ্বস্ত আর্তনাদ।  কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একটু খিচুড়ি রান্না করে কোনরকমে পেটে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।  আমি শহুরে সাংবাদিক।  বন্যা কভার করতে গিয়ে ভাবছি দুমুঠো যদি আমারও জোটে।  আসলে হাঁটছি খিচুড়ির লোভেই। আচমকা হাতে টান।  আমার ভিডিও জার্নালিস্ট সুরজ।  "এটা ত্রানের খিচুড়ি।  এটা ছেড়ে দে।  একটু পরেই তো আমরা বেরিয়ে যাব।  এদের খাবার পাওয়াটা অনেক জরুরি।" যেন তাল ফিরে পেলাম।  আত্ম সংযমী হলাম।  খিচুড়ির দিকে পিছন ফিরে হাঁটা লাগলাম।  

সেই সংযমের পুরস্কার হিসেবে হয়ত আজও নিয়মিত খিচুড়ি জুটে যায়।  এখানে সেখানে।