Monday, 8 June 2015

কিসসা কাউন্টার কা


কাউন্টারের ওপারের লোকজন কি সবসময় এরকম গোমরামুখো শয়তান টাইপের হয়? সবসময় কাজ না করার ইচ্ছে নিয়ে , ওপর দিকের গ্রাহকদের মানুষ বলে না মনে করার মনোভাব নিয়ে বসে থাকে? যেন সর্বক্ষণ ভাবে থাকে দয়া-ভিক্ষা-দাক্ষিণ্য বিতরণ করছে! সত্যি বলতে কি আমি ভালোমানুষ, সহাস্য, সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে কাউন্টারের ওপারে কোনো মানুষকে আজ পর্যন্ত বসতে দেখিনি।  ভালো মানুষ যদি দু একজন পেয়েও থাকি তবে তা এতই নগন্য যে এই মুহুর্তে  কারও মুখ মনে করতে পারছি না।  আপনি দেখবেন, ব্যাঙ্ক বলুন কিম্বা টিকিট কাউন্টার, সরকারি অফিস বলুন বা প্রাইভেট, কোনও কাউন্টারের ওপারে ভালোমানুষ-মুখ দেখতে পাবেন না।  কাজ করতে কী বিরক্তি! তবে কাজ করছিস কেন রে বাবা!

এমন ভাববেন না যে আমি এমনি এমনি এরকম গালাগাল দিচ্ছি।  প্রমান সহযোগে বলতে পারি এ অভিজ্ঞতা আমাদের সবার।  কম বেশি।  ধরুন সরকারি ব্যাঙ্ক, মানে স্টেট ব্যাঙ্ক ট্যান্ক আর কি।  আমি তো পণ করেই ফেলেছি, ওই স্টেট ব্যাঙ্ক এ কখনও একাউন্ট করব না।  বাপ রে বাপ।  কাউন্টারের সামনে তিরিশ জনের লাইন।  কাউন্টারের ওপারের ক্লার্ক মশাই হঠাত উঠে দাঁড়ালেন।  আমাকে এখন খেতে যেতে হবে।  বেশ, খিদে পেয়েছে, তা যান।  কিন্তু কোথাও তো লিখে রাখেননি যে দুপুর ২:৪০ মিনিটে আপনি মধ্যাহ্নভোজ সারতে যাবেন।  আচ্ছা তাও না হয় গেলেন।  কিন্তু আপনার বিকল্প কাউকে বসিয়ে যান।  এই তিরিশ জন গ্রাহক যে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবেন, তাদের কথা একবারও ভাববেন না! প্রতিবাদের কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই ক্লার্ক বাবু উঠতে একটু ইতস্তত করছিলেন।  ওমা! পাশের কাউন্টার থেকে সই করতে ব্যস্ত থাকা ব্যাঙ্ক-এরই  এক মাতব্বর নির্দেশ দিয়ে দিলেন, "আরে যা না।  খিদে পেলে খাবি না? যা যা।  একটু ওয়েট তো করতে হবে দাদা। " অভয়বাণী শোনা মাত্রই বাবু উঠে গেলেন  নিঃশব্দে।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে থাকলেন গ্রাহকরা।  আর মাতব্বর বাবু এক মনে অন্য একটা কাউন্টারে বসেই সই করে যেতে থাকলেন।  সামনে পুরো ফাঁকা।  সেই দেখে একজন অধৈর্য গ্রাহক বলেই ফেললেন, "দাদা আপনি নিয়ে নিন না ডিপোজিট গুলো।" বাবু পাত্তাই দিলেন না।  একজন খালি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন।  কয়েকবারের বৃথা চেষ্টার পরে, বাবু মুখ তুলে তাকিয়ে কৃতার্থ করলেন প্রজাদের, থুড়ি গ্রাহকদের।  ঠান্ডা গলায় বললেন, "ওটা আমার কাজ নয়।  একটু দাঁড়ান।  উনি চলে আসবেন।" উনি যে আবার খাওয়া দাওয়া করে আবার কখন মর্ত্যে অবতীর্ণ হবেন কেউ জানে না।  অগত্যা আবার দীর্ঘশ্বাস।  এর মধ্যে কেউ একজন মাথা গরম করে দু চার কথা শুনিয়েও দিলেন 'মাতব্বর বাবুকে' আর পাল্টা তির ছুটে আসলো কাউন্টারের পিছন থেকে।  নীট ফল আবার দীর্ঘশ্বাস।  

অন্য এক সরকারী ব্যাঙ্ক, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার  এক কর্মী একটি অফিসে নতুন একাউন্ট খোলার জন্য ফর্ম ভরাতে গিয়েছিলন।  জীবনে প্রথমবার। এই 'গ্রাহক-সেবার' কাজে এভাবে নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে তিনি যার পর নাই গর্বিত বোধ করছিলেন।  সে গর্বের যা সাইড এফেক্ট হলো, সে আর বলার নয়।  যে কাজ বেসরকারী ব্যাঙ্ক-এর কর্মীরা রাতদিন করে চলেছেন, সেই কাজ তিনি করে, ক্লান্ত হয়ে সেই অফিস থেকে ব্যাঙ্ক এ ফিরে এলেন।  এবার চেক বই আনতে গিয়ে, সেই কর্মীরই মুখোমুখি হতে হলো ব্যাঙ্ক-এর কাউন্টারে।  তিনি তো সেই অফিসের কর্মীদের দেখে বিগলিত।  বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের দেখে।  কাউন্টারে বসে তিনি নিজের কত কষ্ট হয়েছে, কতটা ঘাম কপাল থেকে পায়ের পাতায় পড়েছে সেসব খতিয়ান দিতে থাকলেন। আর সেই মহিলার পিছনে তখন আরও জনা দশেক গ্রাহক।  অবশেষে যখন সেই মহিলার এক পুরুষ সহকর্মী কাউন্টারের সামনে পৌছালেন, ততক্ষণে ব্যাঙ্ক-এর বাবু আবার ক্লান্ত হয়ে গেছেন।  নিজের আসনে বসেই তিনি এটা সেটা করতে থাকলেন।  দু'তিনবার পাশের কাউন্টারের ক্লান্ত সহযোদ্ধার সঙ্গে বাক্য বিনিময় করলেন।  কাউন্টারে যে একজন দাঁড়িয়ে আছেন সেটা বেমালুম ভুলেই গেলেন মনে হলো।  চেক বই অবশ্য পাওয়া গেল কিছুক্ষণ পরে আর তারপর সেই গ্রাহকের কাছ থেকে এমন ঝাড় খেলেন যে তাতে ব্যাঙ্ক-বাবু মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন।  তার মাথা আর কাজ করতে চাইল না সেই ঝগড়ার পরে।  পরের অপেক্ষমান গ্রাহকদের কপালে অশেষ দুঃখ লেখা ছিল সে আর না বললেই নয়।  

আজ নামী এক বই-বিপনীর কাউন্টারে একজন কর্মীর মুখোমুখি হলাম।  ভিড় ঠেলে কোনরকমে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেও, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলাম।  নিজের দাদাকেও এতবার ডাকতে হয়নি, যতবার ওনাকে ডাকলাম, একবার চোখ ফিরে তাকাবার জন্য।  তাকালেন বটে।  কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।  কি করে পারেন কে জানে! বইয়ের একটা লিস্টি তার হাতে তুলে দেবার চেষ্টা করলাম। হাতে নিলেন না।  আমি তুলে ধরে রইলাম, উনি দূর থেকে পড়ার চেষ্টা করতে থাকলেন। বইগুলো আছে কি নেই, জানানোর আগেই তিনি অন্য এক কাস্টমার দেখে তার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন।  তার চাহিদা পূরণের আগেই আবার পিছন ফিরে কাকে কি একটা নির্দেশ দিলেন।  বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলতে থাকার পর আবার ফিরে এলেন আমার দৃষ্টি-কোণে।  এবার হাতে নিলেন বইয়ের তালিকাটি।  কিছু না বলেই এবাউট টার্ন নিয়ে চলে গেলেন বিপনীর ভিতরে বইয়ের সন্ধানে।  অনেক কাঠখর পুড়িয়ে পাঁচটি বইয়ের মধ্যে দুটো জুটল।  অন্য গুলো পরে পাওয়া যাবে কি যাবে না সে উত্তর আদায় করতে পারলাম না।  কাউন্টারের এপারে দাঁড়িয়ে যা পেয়েছি তাই যথেষ্ট ভেবে চলে আসলাম।  

এরকম অভিজ্ঞতা ভুরি ভুরি আছে।  "এখন হবে না পরে আসুন।" বা "এটা  না আনলে তো ওটা হবে না" ইত্যাদি তো আমাদের শোনা কমন লাইন। বাকি গল্পগুলো পরে একদিন হবে।    

(সঙ্গের ছবিটির সত্যি না মিথ্যে জানি না।  তবে নেট-দুনিয়ার বহুল প্রকাশিত ছবি। এটা যদি সত্যিও হয়, অবাক হব না।)

Sunday, 7 June 2015

সিরিয়াল বিভ্রাট


আচ্ছা এই ভুরিওয়ালা একটা ছেলেকে দেখে লোকের কী করে মনে হয় যে এ টিভি সিরিয়ালের অভিনেতা! কী বিপদ! সেদিন দুপুরবেলা। ছুটির দিন।  বেড়িয়েছি বাড়ি থেকে।  একটু এগোতেই আচমকা এক বয়স্ক ভদ্রলোকের গলা পেয়ে দাঁড়াতে হলো।  
"এই যে। এই তো পেয়েছি।  দাঁড়াও দাঁড়াও।"
আমি হতবাক।  এই ভর দুপুরে ছেলেধরার মত করে এই বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন কেন? আমাকেই বলছেন তো? পিছন ফিরে দেখেও নিলাম একবার।  না আর তো কেউ নেই।  
-- "তোমাকেই বলছি।  দাঁড়াও দাঁড়াও।  এই যে দেখছ।" এই বলে দেখি খানিকটা পিছনে এক বৃদ্ধাকে ডাকছেন।  বয়সের ভারে ভদ্রমহিলা একটু পিছনে পড়ে গেছেন।  আমি ভাবলাম, হয়ত কোনো ঠিকানা জানতে চাইবেন। এ পাড়ায়  আগে ওনাকে কখনো দেখিনি।  আমি বিনীত ভাবে বললাম, "হ্যা, বলুন।.."
-তুমিই তো সিরিয়াল কর।  তাই না? কি যেন চলছে এখন ষ্টার জলসায়। ...
 আমি তো থ! "না আমি নই।  আপনার বোধহয় ভুল হচ্ছে।  অন্য কাউকে ভাবছেন।" আমি স্মিত হেসে বলি।  এক  পা এগোই।  যাবার জন্য।  
---"না না বাবা।  আমি ঠিক চিনেছি।  ওগো দেখছ, এই সেই ছেলেটি না? কি যেন নাম সিরিয়ালটার।.." গিন্নিকে ডেকে চেনাবার চেষ্টা করেন আর চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকেন সিরিয়ালটার নাম।  
আমি আবার বলি, "আপনি অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন আমায়।"
এবার আরও বড় গোলা।  "আরে আমি জানি তোমরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে দিতে চাও না।  কিন্তু আমি ঠিক ধরেছি।  আরে কি আছে! আমরা তো বুড়ো-বুড়ি।  আমাদের কাছে আর কি আছে..."
ভদ্রমহিলাও আমাদের কাছে চলে এসেছেন।  চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছেন।  চশমার ভিতর থেকে দুটো চোখ আমাকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।  স্মৃতির সঙ্গে।  আমি বুঝতে পারছি বিপদ ঘনাচ্ছে।  আমি আবারও বাঁচার একটা চেষ্টা করি। ভাবি টিভিতে দেখে নিউজ চ্যানেলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। সচারচর অপরিচিত লোকজনকে কাজের প্রয়োজন ছাড়া নিজের আসল পরিচয় চট করে দিই না।  তাহলেই লোকে গুটিয়ে নেয় নিজেকে।  কিন্তু এখানে 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা'।
--"আমি সাংবাদিক।  আমি অভিনয় করি না। "
--"আরে আমাদের কাছে লুকোনোর কি আছে? তোমাদের অভিনয় আমাদের খুব ভালো লাগে। যাক গে, তা এখন কি শুটিং এ যাচ্ছ নাকি?"
ভদ্রলোকের ভাব জমানোর চেষ্টায় আমি তো প্রায় কুপোকাত।  এগোতেই পারছি না।  এগোতে দিচ্ছেনও না।  অভদ্রতাও করতে পারছি না।  যে বলব ধুর মশাই, পাগলামো থামান তো।  কার সঙ্গে কাকে মেলাতে চাইছেন! আমার মেলা কাজ আছে।  আমাকে ছাড়ুন।  
উনি বলে চলেছেন, " তা তুমি এদিকেই থাকো? নাকি এপাড়ায় কারো বাড়িতে এসেছিলে? আমাদের বাড়ি এ পাড়ায়।  ওই যে।"  হাত তুলে দেখালেন। 
 আমিও বললাম, "আমি এখানেই কাছে ভাড়া থাকি একটা ফ্ল্যাটে।"
--"তাই নাকি! ও বাবা আমি তো জানতামই না যে এ পাড়ায়  একজন অভিনেতা থাকে।  কয়েকজন হিরোইনকে অবশ্য আসতে দেখেছি ওই পাশের বিল্ডিং-এ।  আর তুমি এখানেই থাক।  আর আমি এতদিনেও জানি না।  কি কান্ড।"
আমার তখন কান্ড-জ্ঞান যেতে বসেছে।  আর ভুল ভাঙ্গানোর কোনো চেষ্টা করা বৃথা বুঝে কোনরকমে কেটে পড়ার তালে আছি।  কোনরকমে ব্যস্ততা দেখিয়ে বললাম, "আমার আসলে দেরী হয়ে যাচ্ছে।  আমি আসি।"
--"নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।  এস এস।  তোমার আবার শুটিং এর দেরী হয়ে যাচ্ছে।  তা কোথায় শুটিং আজ? টালিগঞ্জেই? তুমি তো এপাড়াতেই থাকো। একদিন এস আমাদের বাড়িতে।  আমরা বুড়ো-বুড়ি মিলে  থাকি।  তোমাদের সিরিয়াল দেখেই আমাদের সময় কেটে যায়।"
মনে মনে ভাবি, কি দরকার এসব পচা সিরিয়াল দেখার।  কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে এগোই।  ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাকে আবার আমার করুণ হাসি উপহার দিয়ে। 

.........

আমাকে আমার বন্ধুস্থানীয় এক পরিচালক একবার একটা সিরিয়াল এ অভিনয় করার সুযোগ দেবে বলেছিল।  সে নিজেও তখন সুযোগ খুঁজছিল।  সে যখন কয়েক বছর বাদে সুযোগ পেল, আমাকে বলল আমার চেহারায় নাকি আর সিরিয়াল হয় না।  আমি যে খুব জুলুজুলু নয়নে সিরিয়াল করব বলে অপেক্ষা করছিলাম, তা নয়।  কিন্তু চেহারার খোঁটায় একটু আহত তো হয়েইছিলাম।  যতই বিড়ম্বনায় পড়ি না কেন, পরে মনে মনে ভেবেছি আর হেসেছি যে, এই বৃদ্ধ দম্পতির আশীর্বাদে ক্ষতে একটু আরামের প্রলেপ লেগেছিল বৈ কি।  

(সঙ্গে ষ্টার জলসার আমার খুব প্রিয় একটি সিরিয়াল এর ছবি।  ছবি সৌজন্য: ষ্টার জলসা)

Saturday, 6 June 2015

খিচুড়ি-কথা

সহজ কথায় চালে ডালে। সুস্বাদু থেকে সুস্বাদুতর করার জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর রেসিপি নিশ্চয়ই আছে।  কিন্তু সহজ হোক বা কঠিন, আমার কাছে ব্যাপারটা সুস্বাদুতমই। স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এ খাদ্যবস্তুর গ্রহণযোগ্যতা আমার কাছে প্রশ্নাতীত। সুতরাং লক্ষী পুজো বা সরস্বতী, মনসা বা গনেশ, শনি বা লোকনাথ, ধর্ম কর্মে মন না থাকলেও, পাত পাড়তে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।  শুধুমাত্র ভোগের মেনুতে খিচুড়ি থাকলেই এ বান্দা হাজির। খিচুড়ি জিন্দাবাদ।  

পুজোর ভোগের নেমন্তন্ন থেকে যে আমার খিচুড়ি প্রীতি জন্মেছে, এমনটা নয়।  বঙ্গ গৃহস্থের ঘরে বর্ষা বা বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাদল বরষে তো খিচুড়ি পাতে। অন্ততঃ ছোটবেলা থেকে বৃষ্টি হলেই মা'র কাছে খিচুড়ির বায়না ছিল অবধারিত।  তারপর, আলু ফুলকপি সহযোগে, ঘি, বেগুন ভাজা, ডিম ভাজা, পাঁপড় আর ভাগ্য ভালো থাকলে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে জমিয়ে ঘন খিচুড়ি।  আহা! শীতকালের রাত্রিরেও খিচুড়িরব্যাপারটা  থেকে ভালো মেনু আর কিছু ছিল না।  মা আবার মশলাপাতি না থাকলে, ঠিক ডাল না থাকলে, খিচুড়ি রান্না করতে চাইত না। কিন্তু তখন মনে হত মশলাপাতি কি দরকার! চালে ডালেই তো খিচুড়ি হয়ে যায়।  নিজে কখনও রাঁধিনি, তাই রাঁধুনির চোখ দিয়ে কখনও খিচুড়ির কথা ভাবিনি।  আমার সবই চলে।  এখনও চলে। 

বাসি খিচুডির স্বাদ অনবদ্য।  তাই শুধু রাতে নয়, কিছুটা রেখে সকালবেলা ব্রেকফাস্ট খিচুড়ি দিয়ে সেরে নেয়ার বন্দোবস্ত করে রাখা হত।  ব্রেকফাস্ট এ খিচুড়ি! শুনে অনেকেই নাক সিঁটকোতেন।  বিশেষ করে আমার নরেন্দ্রপুরের অনেক বন্ধুই।  কিন্তু শুক্রবার রাতে ভবনের খাবারের মত রবিবার সকালের জলখাবারের দিকেও আমার মন পড়ে থাকত।  কে শুরু করেছিলেন ঠিক জানি না।  যাঁরাই করে থাকুন তাঁদের আমার অন্তরের ধন্যবাদ।  ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টায় রবিবার সকালের মেনু ছিল খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজা।  অমৃতের মত তারিয়ে তাড়িয়ে খেতাম।  অনেকেই খেত না বলে বোধহয় ভাগেও বেশি পেতাম।  বাসি আর নরেন্দ্রপুরের খিচুড়ি আমার বড় প্রিয়।  তবে পুজোর ভোগের মত খিচুড়ির স্বাদ আর বোধহয় কিছুতেই নেই।  লক্ষী পুজোর নেমন্তন্ন পাওয়ার জন্য ছটফট করতাম। শুধু ওই ভোগের খিচুড়ি খাব বলে।  আমার ব্যক্তিগত ধারণা পূর্ববঙ্গীয় মানুষেরা খিচুড়ি ভোগ ভালো রাঁধেন।  বেশ জমাট বাঁধা।  সঙ্গে লাবড়ার সঙ্গত।  লিখতে লিখতেই জিভে জল চলে আসছে।  মা লক্ষী আমাকে নিজগুনে ক্ষমা করে ঠিক খিচুড়ি জুটিয়ে দেন ফি বছর।  

তবে অনেক পরে জেনেছি, পেটের পক্ষে খিচুড়ি পথ্য হিসেবে কাজ করে।  ফাইভ ষ্টার হোটেলে বসে দেশের এক বড় রাজনীতিককে দই দিয়ে খিচুড়ি খেতে দেখে বেশ অবাকই হয়ে ছিলাম। তবে শরীর সুস্থ থাকবে এই অছিলায় আমিও আজকাল নিয়মিত খিচুড়ি খাই। "করতে গেলাম ভাত আর হয়ে গেল খিচুড়ি" - এই গল্পও আমাকে ফুটপাথের খিচুড়ি খাওয়া থেকে থামাতে পারে নি।  (এক বিধবা মহিলা গঙ্গা স্নান করে এক ঘটি গঙ্গা জল নিয়ে এসে একটু চাল দিয়ে সেই ঘটিতেই ভাত বসিয়েছিলেন।  ওমা।  যখন ভাত নামাতে যাবেন, দেখেন একি এতো হলুদ খিচুড়ি হয়েছে! পরে বুঝেছিলেন, গঙ্গা জল তোলার  সময় জলের সঙ্গে  মনুষ্য বিষ্ঠাও তুলে এনেছিলেন। তাই ভাত হলো খিচুড়ি )

দিন দিন আমার খিচুড়ি-পাগলামো যেন বেড়েই চলেছে। যেখানে পাই সেখানেই খাই।  আত্মীয়-স্বজনরাও জেনে গেছে। গেলেই খিচুড়ির লোভ দেখিয়ে আটকে দেয়।  কাজের ব্যস্ততায় পুজোর নেমন্তন্ন রক্ষা না করতে পারলেও, বাড়ি বয়ে খিচুড়ি ভোগ দিয়ে যায়।  খিচুড়ি রান্না হলে আগাম নিমন্ত্রণ চলে আসে।  আর আমিও তেমন। রাত বারোটায় একবার এক শনি মন্দিরের সামনে হাজির হয়েছিলাম। খবর ছিল, ভোগ বিতরণ হচ্ছে।  একসময় যে খাবার বিলাসিতার জন্য রসিয়ে বানাত মা, আজকাল আমরা নবীন দম্পতি তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর থাকলে বা বাড়িতে কোনো খাবার না থাকলে একটু চালে ডালে বসিয়ে নিয়ে থাকি।  

একবারই আমি খিচুড়ি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম।  হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, "আমাদের এখানে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।  আপনারা চলে আসুন।" উঁকি মেরে দেখে নিয়েছিলাম, খাওয়া মানে খিচুড়ি।  প্রচুর বাচ্চা, মহিলা, পুরুষদের সঙ্গে আমিও হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেই ঘোষণাস্থলের উদ্দ্যেশে।  অন্যদের হাতে বাটি, থালা, পেটে খুব খিদে, চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যত।  পাকা রাস্তার দুধারে খোলা আকাশের নিচে শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে ওদের অবস্থান।  আর দূর দুরান্তে যেদিকে চোখ যায়, শুধু জল আর জল।  টালির বাড়ির মাথাটুকু দেখা যাচ্ছে বা নারকেল গাছের আগা।  পাকা রাস্তা থেকে আজ সকালেই জল নেমেছে।  সেখানেই উঠে এসেছে বন্যা বিধ্বস্ত আর্তনাদ।  কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একটু খিচুড়ি রান্না করে কোনরকমে পেটে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।  আমি শহুরে সাংবাদিক।  বন্যা কভার করতে গিয়ে ভাবছি দুমুঠো যদি আমারও জোটে।  আসলে হাঁটছি খিচুড়ির লোভেই। আচমকা হাতে টান।  আমার ভিডিও জার্নালিস্ট সুরজ।  "এটা ত্রানের খিচুড়ি।  এটা ছেড়ে দে।  একটু পরেই তো আমরা বেরিয়ে যাব।  এদের খাবার পাওয়াটা অনেক জরুরি।" যেন তাল ফিরে পেলাম।  আত্ম সংযমী হলাম।  খিচুড়ির দিকে পিছন ফিরে হাঁটা লাগলাম।  

সেই সংযমের পুরস্কার হিসেবে হয়ত আজও নিয়মিত খিচুড়ি জুটে যায়।  এখানে সেখানে।  

Wednesday, 11 March 2015

ঈক্ষণকাম


আমি সাইকেল চালাতে ভালোবাসি। আমার বাড়ি এক মফস্বল শহরে।  কলকাতা থেকে খুব দুরে নয়।  আমার খুব প্রিয় জায়গা  সেটা।  যদিও ফ্ল্যাট সংস্কৃতি হানা দিছে ধীরে ধীরে।  কিন্তু এখনো সেই পুরনো একতলা বা দোতলা একক বাড়িরই প্রাধান্য।  ছোট ছোট রাস্তা আর অনেক গাছপালা।  অনেক মাঠেই বাড়ি উঠে গেছে।  তবু কিছু খেলার মাঠ এখনো অবশিষ্ট আছে।  আমার সেই শহরের (যাকে এখনো লোকে গ্রাম বলে) অলি গলি দিয়ে সাইকেল চালাতে খুব ভালো লাগে।  যখন আমি স্কুলে-কলেজে  পড়তাম তখন সন্ধ্যেবেলায় মায়ের কাছে থেকে একটু ছুটি নিয়ে সেইসব রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে বেড়াতাম। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না।  আপন মনে এ গলি থেকে সে গলি ঘুরে বেড়াতাম।  গন্তব্য না থাকলেও একটা রুট ম্যাপ ছিল মনে মনে।  যে সব রাস্তা দিয়ে গেলে নিশ্চিন্তে যাওয়া যাবে।  বেশি গাড়িঘোড়া নেই, চড়া আলো নেই।  এমন রাস্তা দিয়েই আমি সাইকেল চালাতাম।  কখনো কখনো কুকুরের তাড়া  খাইনি তা নয়।  কিন্তু আলো -আঁধারী  রাস্তাই আমার বড় পছন্দের ছিল।  ওখানে অনেক বাড়ি।  আমাকে অনেকে চিনত।  কিন্তু বেশিরভাগ লোকজনই আমাকে চিনত না।  আমি চাইতামও না কেউ আমাকে চিনুক। কারণ সাইকেল চালানো আমার কাছে মেডিটেশন করার মত ছিল।  ওই সাইকেল চালানোর সময়েই মনের অনেক প্রশ্নের জবাব আমি নিজের কাছেই পেয়ে যেতাম।  অনর্গল কথা বলে চলতাম নিজের সঙ্গে।  সাইকেল প্যাডেলে চলত পা আর মন চলত এদিক থেকে ওদিক। এক সময়ে শান্ত হত। সন্ধ্যেবেলায় সাইকেল চালাতে চালাতে আমার অনেকের সঙ্গে পরিচিতি হয়ে গিয়েছিল। না,  বলা ভালো আমি পরিচিত হয়েছিলাম।  ওই বাড়িগুলোর মানুষজনের মুখ, কাজ কর্ম সব আমার জানা হয়ে গিয়েছিল।  ওদের আমার ভালো লাগত।  ওরা আমাকে না চিনলেও আমি ওদের চিনতাম।  একটা বাড়ির জানালার পাশে এক বৃদ্ধ বসে থাকতেন।  একদিন দেখালাম সেখানে একটা বিছানা।  বিছানায় শুয়ে সেই বৃদ্ধ, পাশে বসে এক মহিলা।  বুঝলাম বৃদ্ধ অসুস্থ।  অনেকদিন পর সাইকেল চালাতে গিয়ে দ্দেখলাম, ওই জানালা বন্ধ।  ওই বৃদ্ধকে আর দেখতে পাইনি। পরে বুঝে নিয়েছি তিনি আর নেই।  আমি সেই বৃদ্ধ কে চিনতাম না।  তাঁর নাম জানতাম না।  কিন্তু তিনি আমার পরিচিত ছিলেন।  বা ধরা যাক একটি বাড়ির এক দিদি।  দেখতাম ঘরে বসে খুব পড়াশোনা করত।  হয়ত ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। এটা আমার ধারণা ছিল। নিশ্চিত নই।  একদিন তার বিয়ে হয়ে গেল।  দেখলাম, আলো দিয়ে সাজানো বাড়ি।  কোনো বাড়ির দাদা চাকরি সুত্রে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন।  আমায় কেউ বলেনি।  আমি সাইকেল চালাতে চালাতে ওই বাড়ি সামনে দিয়ে যেতে যেতে কেমন করে যেন জেনে গেছি। এমন অনেক পরিচিত একে একে চলে গেছেন ওই এলাকা ছেড়ে।  অনেক বাচ্চাকে বড় হতে দেখেছি।  একতলা বাড়ি দোতলা হয়েছে।  এমন অনেক পরিবর্তন আমার সাইকেল থেকেই দেখা।  কোনদিন আমি দাঁড়িয়ে কথা বলিনি ওদের সঙ্গে।

এখন আমিও ওই মফস্বল শহর ছেড়ে বাসা বেঁধেছি মূল শহরে।  অনেকদিন কাজের চাপে অনেকটা সময় নিয়ে যাওয়া হয় না। যাওয়া হলেও সাইকেল নিয়ে বেরই না।  আলসেমি করি বা একটু হেঁটে আসি বাড়ির কাছাকাছি। সাইকেলটার যত্ন নেওয়া হয়না বিশেষ।  খুব সম্প্রতি একদিন একটু সাইকেল চালিয়ে আসলাম।  সত্যি কথা বলতে কি যেন প্রাণ ভরে শ্বাস নিলাম। শুদ্ধ হলো দেহ মন।  স্বাভাবিকভাবেই আমার 'পরিচিত'জনের মধ্যে অনেকেই নেই দেখলাম। একটি বাড়িতে একজন বয়স্ক মানুষ থাকতেন।  তাঁর স্ত্রী আর দুই মেয়ে।  মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল জানি।  সেই ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী সন্ধ্যেবেলায় একতলার ঘরে বসে টিভি দেখতেন।  আমার ওদের দেখতে ভালো লাগত।  আমি দুপাক ঘুরেও নিতাম সাইকেল করে ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে।  সেদিন দেখলাম বাড়ি তালা বন্ধ।

আজ  ফেসবুকের সৌজন্যে সেই দুই মেয়ের এক মেয়ের প্রোফাইল খুঁজে পেলাম।  সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ছবি দেখলাম অ্যালবাম জুড়ে।  কমেন্টস -এ দেখলাম লেখা "গত ৩০শে এপ্রিল মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন"। বাবার ছবির পাশে লেখা "কতদূর চলে গেছো"।  দেখে মনটা থেমে গেল।  একটা ঝটকা।  আমি ওনাদের সঙ্গে কখনো কথা বলিনি।  তবু মনে হলে আমার পরিচিতজন চলে গেছেন। আমি জানিও না।

মেয়েটি কাউকে লিখেছে, "আমার বাপের বাড়ির পালা সাঙ্গ হয়ে গেছে"।

এমন কত পরিচিত কথা আমার জানা নেই।  জানা হয়নি।  আজকাল সাইকেল চালাই না আমি।     

Sunday, 31 August 2014

রবি ঠাকুর দেখছেন সব




ছোটবেলায় বাবা মা'র সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিলাম। খুব ছোট ছিলাম তখন।  কিন্তু এখনো মনে আছে একজন রবীন্দ্র ভবনের সামনের বাগানে বসে ছবি আঁকছিল।  আমি পিছনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।  বাগানের একটা ফুলের স্কেচ করছিল।  এরকম অনেকেই এধার ওধার, বসে ছবি আঁকছিল।  খোলা আকাশের নিচে বসে কাউকে ছবি আঁকতে আমার প্রথম দেখা। তারপর ওই আম্রকুন্জের কাছে গিয়ে ছেলেমেয়েরা গাছের নিচে বসে ক্লাস করছে, সেটাও আমার কাছে প্রথম দেখা।  রবি ঠাকুরের বাড়িগুলো, ব্যবহার করা জিনিসপত্র, বই আর প্রচুর গাছপালা চারিদিকে - এসব একে একে দেখে একটা বই ' আমাদের শান্তিনিকেতন' কিনে আমরা বাড়ি ফিরেছিলাম।  আর তারপর থেকে আমার শান্তিনিকেতনে থাকা আর পড়াশোনা করার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরী হয়েছিল।  আমার মনে আছে বাবা আমার জন্য পাঠভবনের ফর্ম এনেছিল।  কিন্তু নানা কারণে সে আর জমা দেওয়া হয়নি।  আমারও আর শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করা হয়নি। মনে মনে সুপ্ত বাসনা ছিল যে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কোনো একটা বিষয় নিয়ে  বিশ্বভারতীতে ভর্তি হব।  সেটাও আর হয়নি।

কিন্তু শান্তিনিকেতনের প্রতি অমোঘ টান আমার বরাবর থেকে গেছে।  বড় হওয়ার পরও সে টান এতটুকুও কমেনি। বরং সে টান রোমান্টিকতায় পরিণত হয়েছিল।  তাই কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে যে বার আমরা বসন্ত উত্সবে গিয়েছিলাম, সেবার সবাই মিলে ঠিক করেছিলাম, আমরা টাকা একসঙ্গে করে একটা বাড়ি বানাবো বোলপুরে।  আর ওটা আমাদের কমিউন হবে।  থাকা, খাওয়া, গান-বাজনা, বই পড়া - সব হবে ওখানে।  আমরা শান্তিনিকেতনের কোলে থাকব।  যারা শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা তাদের একটু হিংসেও করতাম আমরা। আর শান্তিনিকেতনের যে সব বন্ধুরা পড়াশোনা করেছে, তাদেরও লুকিয়ে লুকিয়ে হিংসে করতাম।  এখনো করি।  ওখানে থাকা মানেই মনটা  একদম অন্যরকম হয়ে যাওয়া।  সৃজনশীলতার পরিচর্যা।  অনেক পড়া, অনেক লেখা, অনেক গান, অনেক নাচ, অনেক ছবি আঁকা, অনেক ঘুরে বেড়ানো না-ছোঁয়া প্রকৃতির মাঝে।  আবাসিক জীবনের প্রতি ঝোঁক থেকে জানি এই গুরু-শিষ্যের কাছাকাছি থাকার আত্মিক গুরুত্বটা  কতটা।  আমার এক পিসি আর এক কাকিমা শান্তিনিকেতনের ছাত্রী ছিলেন।  ওদের থেকে টুকরো টুকরো গল্প শুনে শান্তিনিকেতন আমার কাছে একটা মিথের মত হয়ে উঠেছিল।  ওখানে গেলেই আর আমার বন্ধুস্থানীয় দাদাদের সঙ্গে ওখানে গিয়ে কথা বললেই বা কিছু সময় কাটালেই জীবনটা কি সহজ লাগত।  চুপচাপ বসে গাছপালার গন্ধ শুষে নিলেই যেন মন থেকে শব্দরা বেরিয়ে আসে।  খোয়াইয়ে বসে বন্ধুদের আড্ডা।  ক্যানেলের কাছে দাঁড়িয়ে পূর্নিমার চাঁদ। কোপাই নদীর ধারে শুয়ে গল্প।  কলাভবনের গাছের নিচে বসে গান।  ভালো মন্দের খাওয়া।  ভুবনডাঙার মাঠের কোণে  দাড়িয়ে আকাশ জোড়া কালো মেঘ।  বাউল গান। অজানা সুন্দর মুখ।  শান্তিনিকেতন জুড়ে অসংখ্য স্মৃতি জড়ো হয়েছে আমার। 

সেদিন, ২৯শে অগাস্ট, ২০১৪।  শুক্রবার।  অন্য অনেকদিনের মতই, হুট করে শান্তিনিকেতন রওনা দিতে হলো দুপুরবেলা।  কাজে।  আজকাল এভাবেই শান্তিনিকেতন যাওয়া হয় আমার।  পরিকল্পনা করে পারিবারিকভাবে শান্তিনিকেতন শেষ কবে গেছি মনে নেই।  ঘন্টা তিনেকের ড্রাইভ।  বিশ্বভারতীর সেন্ট্রাল অফিস- এর সামনে গাড়িটা দাড়ালো যখন তার একটু আগেই কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।  রাস্তা ভিজে।  গাছের পাতাগুলো আরও সবুজ।  গাড়ি থেকে নামতেই সেই দারুণ গন্ধটা পেলাম।  ফুল, গাছ, মাটির সোঁদা গন্ধ মিলে গিয়ে একটা অদ্ভূত মনোরম গন্ধ তৈরী হয়।  এই গন্ধ আমি চিনি।  নরেন্দ্রপুরে থাকার সময় থেকেই আমি গন্ধটা চিনি।  মিঠে এবং মেঠো  গন্ধ।  বিকেলের শান্তিনিকেতনে মনটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে।  হয়ত সেই রোমান্টিকতার চিনচিনে একটা ব্যথা।  

যেই ক্যামেরা-মাইক নিয়ে সেন্ট্রাল অফিস-এর গেট এ ঢুকলাম, সব রোমান্টিকতা পিছনে।  তখন আমি আদ্যপান্ত একজন প্রফেশনাল।  খবর করতে এসেছি।  কি সেই খবর? কলাভবনের এক ছাত্রীর যৌন হেনস্থার খবর।  সেখানেই শেষ নয়।  এই হেনস্থার খবর জেনেও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চুপচাপ বসে ছিলেন। ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন।  ছাত্রীটির বাবা অভিযোগ করেন যে উপাচার্য তাঁকে ঘুষ দিয়ে পুলিসে যেতে নিশেদ করেছিলেন। এসবের মধ্যে ছাত্রীটি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। মনের মধ্যে উপাচার্য আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের উপর একটা বিরক্তি।  একটা রাগ।  খবর চেপে রাখতে তো পারেননি।  উল্টে কি বার্তা দিলেন বর্তমান আর ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের? এরকম গর্হিত অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়।  এরকম অভিযোগ ভুরি ভুরি রয়েছে বর্তমান প্রশাসকদের বিরুদ্ধে।  ঘন বুনো গাছপালা ঘেরা ইন্দিরা ভবনের ভিতর থেকে যেভাবে কড়া নিরাপত্তায় ছাত্রীটি ও তার বাবাকে বের করে নিয়ে গিয়ে, পুলিসে যেতে না দিয়ে, সযত্নে উত্তরবঙ্গের ট্রেন ধরিয়ে দেওয়া হলো, তা আমি অবাক হয়ে দেখলাম।  এই ছাত্রীটি তো বোধহয় আর বিশ্বভারতীতে ফিরে আসবেন না।  এই খবর দেখা ও ঘটনা পরম্পরা জানা অনেক অভিভাবক আর তাঁদের সন্তানদের শান্তিনিকেতনে পড়তে পাঠাবেন না।  শান্তিনিকেতনে ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, যে স্বপ্ন আমি, আমার মত হাজারো গুণমুগ্ধরা এবং আরও অনেক ছাত্ররা, প্রাক্তনীরা দেখেছেন, কিভাবে কয়েকজন স্বেছাচারী, তাঁবেদার প্রশাসক ও শিক্ষকরা সেটা সযত্নে ভেঙ্গে দিচ্ছেন ধীরে ধীরে।  লুঠতরাজ চালাচ্ছেন।  

সন্ধ্যে নেমে এলো।  চারিদিকে অন্ধকার।  গন্ধটা তখনও পাচ্ছি।  সঙ্গে নানা পোকার ঝিঝি আওয়াজ।  মনটা ভারী।  ভাবছি শান্তিনিকেতন একটা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই থেকে যাবে? রোমান্টিকতার চিনচিনে ব্যথা নিয়ে অনেকেরই আর হয়ত আশ্রমিক হয়ে ওঠা হবে না।  রবি ঠাকুর নিশ্চই দেখছেন।  দেখবেন। তার বুকে অন্য ব্যথা।  জানি। 

Saturday, 22 February 2014

অসামাজিক

ছবি সৌজন্য : জয়ীতা রায়
আমার বন্ধুবান্ধবরা আমাকে খুব একটা 'সামাজিক মানুষ' হিসেবে ভাবেন না।  অনেকে হতাশ হয়ে আমাকে ত্যাগও করেছেন। কাজ আর বাড়ি - এর বাইরে আমার খুব একটা বিচরণক্ষেত্র  নেই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যেটুকু যোগাযোগ সেটা ওই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আর ফোনে। মূলত অফিসের এবং কাজের বন্ধুদের সঙ্গেই এদিক ওদিক খেতে যাওয়া। তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় আলো আঁধারী ঘরের এক কোনে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খাওয়াদাওয়া।  এহেন আমি ঠিক করেছি নিজেকে একটু 'সামাজিক' করে তুলব। তারই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গতকাল সাইন্স সিটি অডিটোরিয়ামে যাওয়া। মির্চি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড -এ।  

সচরাচর আমি এসব অনুষ্ঠান এড়িয়েই চলি।  নিমন্ত্রণপত্র আসে অনেক। কিন্তু কাজের প্রয়োজন ছাড়া ওপথ মাড়াই না।  আমার বন্ধু আর. জে. রিয়া টিজার ক্যাম্পেনের মত গত সপ্তাহ থেকে আমাকে নেমন্তন্ন করছিল দফায় দফায়। দোলাচলে ছিলাম।  শেষমেষ হাতে নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একবার ঘুরেই আসবো।  এতবার বলল। সঙ্গে বউকে নিয়ে যেতে পারব ভেবে ভালো লাগলো। আমার 'অসামাজিক' পরিচয়টা বউএর  কাছেও ঘোচাবার তাগিদ ছিল।  কারণ আমার ঘরমুখো বা ঘরকুনো ইমেজ যাই বলুন না কেন, সেটা আমার বৌএর কাছে অসহ্য হয়ে উঠছিল।  বেশ বুঝতে পারছিলাম। তাই এক ঢিলে অনেক পাখি মারার সুযোগটা ছাড়তে চাইছিলাম না। শুধু একটাই চিন্তা ছিল।  যদি কোনো কাজ এসে যায়, তাহলেই কেলো।  এই অনিশ্চয়তাই আমার 'সামাজিক' হয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা বলেই আমি মনে করি।

যাই হোক সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অনুষ্ঠান শুরুর প্রায় আড়াই ঘন্টা পরে পৌছালাম সায়েন্স সিটিতে। পরিচিত আয়োজকরা রাস্তা বাতলে দিল। লাল কার্পেট ধরে যেতে হবে।   চোখ ধাঁধানো আলো চারিদিক থেকে এসে পড়ছে মুখে।  চোখ খুলে রাখাই দায়।  আলো আর লাল কার্পেট দেখেই মনে পরে গেল যে ভুলটা করেই ফেলেছি। নিমন্ত্রণপত্রের একটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশটা উপেক্ষা করে গেছি। লেখা ছিল: পোশাক: গ্ল্যামারাস।  লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হলে যা পোশাক দরকার তা আমার নেইও আর অত 'ফর্মাল' হয়ে আমার কোথাও যেতেও ইচ্ছে করে না।  যে কারণে সেনাবাহিনীর ভোজসভাতে যাওয়ার ইচ্ছেই প্রকাশ করি না।  লাল কার্পেট পর্যন্ত এসে যখন পড়েছি আর তাও আবার বৌএর হাত ধরে, তখন ফেরার কোনো উপায় নেই।  অগত্যা নিজের ভিতরের সমস্ত স্মার্টনেস কে সম্বল করে এগিয়ে চলা আর টুক করে বসে পরা ভিতরে গিয়ে। 

এসব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার অনুষ্ঠান সত্যি বলতে কি টিভি ছাড়া অডিটোরিয়াম এ বসে দেখার সৌভাগ্য কখনো আমার হয়নি। আর চারপাশে সেলেব্রিটিদের দেখে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তালে তাল মিলিয়ে কখন ঠিক হাততালি দিতে হবে বা কখন দিতে হবে না।  কখন প্রাণ খুলে হাসতে হবে বা শিলাজিতের গানে গলা মেলানো যাবে কিনা।  খুব পছন্দের গায়ক বা অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দেখে ঠিক কতটা উত্তেজনা প্রকাশ করা উচিত  - এসব বোঝা কঠিন।  নিজের আসনে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে গেলাম যা করার করে ফেলেছি এবার চেপে বসে থাকতে হবে। তবু  'মুখ তো দেখিয়েই দিয়েছি রিয়াকে, এবার বেরিয়ে গেলে হয় না' - প্রস্তাবটি আমার সহধর্মিনীর সামনে রাখতেই ওর মুখের চেহারা বদলে গেল।  থমথমে হয়ে উঠলো প্রথমে আর তারপর চাপা অথচ ঝাঁঝালো স্বর নিক্ষেপ। উত্তর এলো, 'তোমার যেতে হলে যাও, আমি পুরো অনুষ্ঠান দেখে একাই ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি চলে যাব।  এসেছি যখন মাধুরীকে দেখেই যাব।' এটাই আসল ব্যাপার আর কী।  বর চুলোয় যাক, মাধুরীর মধু টপ প্রায়োরিটি।  উপায় না দেখে আমার সেই আলতো হাসি মুখে ছুঁইয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করার চেষ্টায় মনোনিবেশ করলাম।  ধকধক গার্ল আসুক। তাকে দেখার জন্যই বসে থাকি।  অভিজিত  রেকর্ডেড গানের সঙ্গে শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে চলে গেল।  নুসরাত এক জায়গায় দাড়িয়ে কোমর নাড়িয়ে হাত পা ছড়িয়ে নেচে চলে গেল।  মাঝে মাঝে পুরস্কার প্রদান।  আর শিলাজিত ওটা গান গাইল না মিউজিক্যালি কথা বলে চলে গেল, বুঝতে বুঝতেই ঘন্টা দেড়েক কাটিয়ে দিলাম।

এর মাঝে একমাত্র সুন্দরীদের আড়চোখে দেখা আর দুই সঞ্চালক মনে একটু ভালো লাগা সঞ্চালন করল। মীর আর শাশ্বত। মাধুরিদেবী মঞ্চে আসা পর্যন্ত ওদের সুক্ষ এবং স্থূল মজাতেই যা একটু নিশ্বাস প্রশ্বাস নিলাম আর কি।  মাধুরীর রূপে মুগ্ধ হতে হতে ভাবছিলাম, আচ্ছা এনার তো কোনো গ্ল্যামারাস পোশাকের দরকার হয় না।  পুরো প্যাকেজটাই এত গ্ল্যামারাস যে কিছু না পড়লেও চলে। স্বচক্ষে মাধুরীকে দেখে  নিজের এবং বৌএর জন্মস্বার্থক করে যখন এক্সিট লেখা দরজার দিকে এগোলাম, যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।  পুরনো বন্ধু প্রেমার সঙ্গে দেখা করে বৌকে বগলদাবা করে মুক্ত আকাশের নিচে দাড়িয়ে কী আনন্দই না হলো।  কারো কারো মত গ্রীনরুমে গিয়ে মাধুরীর সঙ্গে ফটো তোলার  শখ ভাগ্যিস ছিল না।  নয়তো ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসতে হত।

গাড়িতে উঠতে উঠতে মীরের একটা কথাই মনে লেগে ছিল।  ও মজা করছিল বটে, কিন্তু আমার ওটাই  সত্যি মনে হলো।  'এই অডিটোরিয়াম এ যারা এই অনুষ্ঠান দেখতে এসেছে তাদের কোনো কাজ নেই।  নয়তো কেউ শখ করে পাঁচ ঘন্টা এভাবে বসে থাকতে পারে এই ভর সন্ধ্যেবেলায়!'

সত্যি মাইরি! নিকুচি করেছে এহেন 'সামাজিক' হওয়ার চেষ্টার।

(পুনশ্চ: ধন্যবাদ রিয়া, এত মিষ্টি করে ডাকার জন্য।)