কাউন্টারের ওপারের লোকজন কি সবসময় এরকম গোমরামুখো শয়তান টাইপের হয়? সবসময় কাজ না করার ইচ্ছে নিয়ে , ওপর দিকের গ্রাহকদের মানুষ বলে না মনে করার মনোভাব নিয়ে বসে থাকে? যেন সর্বক্ষণ ভাবে থাকে দয়া-ভিক্ষা-দাক্ষিণ্য বিতরণ করছে! সত্যি বলতে কি আমি ভালোমানুষ, সহাস্য, সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে কাউন্টারের ওপারে কোনো মানুষকে আজ পর্যন্ত বসতে দেখিনি। ভালো মানুষ যদি দু একজন পেয়েও থাকি তবে তা এতই নগন্য যে এই মুহুর্তে কারও মুখ মনে করতে পারছি না। আপনি দেখবেন, ব্যাঙ্ক বলুন কিম্বা টিকিট কাউন্টার, সরকারি অফিস বলুন বা প্রাইভেট, কোনও কাউন্টারের ওপারে ভালোমানুষ-মুখ দেখতে পাবেন না। কাজ করতে কী বিরক্তি! তবে কাজ করছিস কেন রে বাবা!
এমন ভাববেন না যে আমি এমনি এমনি এরকম গালাগাল দিচ্ছি। প্রমান সহযোগে বলতে পারি এ অভিজ্ঞতা আমাদের সবার। কম বেশি। ধরুন সরকারি ব্যাঙ্ক, মানে স্টেট ব্যাঙ্ক ট্যান্ক আর কি। আমি তো পণ করেই ফেলেছি, ওই স্টেট ব্যাঙ্ক এ কখনও একাউন্ট করব না। বাপ রে বাপ। কাউন্টারের সামনে তিরিশ জনের লাইন। কাউন্টারের ওপারের ক্লার্ক মশাই হঠাত উঠে দাঁড়ালেন। আমাকে এখন খেতে যেতে হবে। বেশ, খিদে পেয়েছে, তা যান। কিন্তু কোথাও তো লিখে রাখেননি যে দুপুর ২:৪০ মিনিটে আপনি মধ্যাহ্নভোজ সারতে যাবেন। আচ্ছা তাও না হয় গেলেন। কিন্তু আপনার বিকল্প কাউকে বসিয়ে যান। এই তিরিশ জন গ্রাহক যে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবেন, তাদের কথা একবারও ভাববেন না! প্রতিবাদের কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই ক্লার্ক বাবু উঠতে একটু ইতস্তত করছিলেন। ওমা! পাশের কাউন্টার থেকে সই করতে ব্যস্ত থাকা ব্যাঙ্ক-এরই এক মাতব্বর নির্দেশ দিয়ে দিলেন, "আরে যা না। খিদে পেলে খাবি না? যা যা। একটু ওয়েট তো করতে হবে দাদা। " অভয়বাণী শোনা মাত্রই বাবু উঠে গেলেন নিঃশব্দে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে থাকলেন গ্রাহকরা। আর মাতব্বর বাবু এক মনে অন্য একটা কাউন্টারে বসেই সই করে যেতে থাকলেন। সামনে পুরো ফাঁকা। সেই দেখে একজন অধৈর্য গ্রাহক বলেই ফেললেন, "দাদা আপনি নিয়ে নিন না ডিপোজিট গুলো।" বাবু পাত্তাই দিলেন না। একজন খালি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। কয়েকবারের বৃথা চেষ্টার পরে, বাবু মুখ তুলে তাকিয়ে কৃতার্থ করলেন প্রজাদের, থুড়ি গ্রাহকদের। ঠান্ডা গলায় বললেন, "ওটা আমার কাজ নয়। একটু দাঁড়ান। উনি চলে আসবেন।" উনি যে আবার খাওয়া দাওয়া করে আবার কখন মর্ত্যে অবতীর্ণ হবেন কেউ জানে না। অগত্যা আবার দীর্ঘশ্বাস। এর মধ্যে কেউ একজন মাথা গরম করে দু চার কথা শুনিয়েও দিলেন 'মাতব্বর বাবুকে' আর পাল্টা তির ছুটে আসলো কাউন্টারের পিছন থেকে। নীট ফল আবার দীর্ঘশ্বাস।
অন্য এক সরকারী ব্যাঙ্ক, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার এক কর্মী একটি অফিসে নতুন একাউন্ট খোলার জন্য ফর্ম ভরাতে গিয়েছিলন। জীবনে প্রথমবার। এই 'গ্রাহক-সেবার' কাজে এভাবে নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে তিনি যার পর নাই গর্বিত বোধ করছিলেন। সে গর্বের যা সাইড এফেক্ট হলো, সে আর বলার নয়। যে কাজ বেসরকারী ব্যাঙ্ক-এর কর্মীরা রাতদিন করে চলেছেন, সেই কাজ তিনি করে, ক্লান্ত হয়ে সেই অফিস থেকে ব্যাঙ্ক এ ফিরে এলেন। এবার চেক বই আনতে গিয়ে, সেই কর্মীরই মুখোমুখি হতে হলো ব্যাঙ্ক-এর কাউন্টারে। তিনি তো সেই অফিসের কর্মীদের দেখে বিগলিত। বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের দেখে। কাউন্টারে বসে তিনি নিজের কত কষ্ট হয়েছে, কতটা ঘাম কপাল থেকে পায়ের পাতায় পড়েছে সেসব খতিয়ান দিতে থাকলেন। আর সেই মহিলার পিছনে তখন আরও জনা দশেক গ্রাহক। অবশেষে যখন সেই মহিলার এক পুরুষ সহকর্মী কাউন্টারের সামনে পৌছালেন, ততক্ষণে ব্যাঙ্ক-এর বাবু আবার ক্লান্ত হয়ে গেছেন। নিজের আসনে বসেই তিনি এটা সেটা করতে থাকলেন। দু'তিনবার পাশের কাউন্টারের ক্লান্ত সহযোদ্ধার সঙ্গে বাক্য বিনিময় করলেন। কাউন্টারে যে একজন দাঁড়িয়ে আছেন সেটা বেমালুম ভুলেই গেলেন মনে হলো। চেক বই অবশ্য পাওয়া গেল কিছুক্ষণ পরে আর তারপর সেই গ্রাহকের কাছ থেকে এমন ঝাড় খেলেন যে তাতে ব্যাঙ্ক-বাবু মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন। তার মাথা আর কাজ করতে চাইল না সেই ঝগড়ার পরে। পরের অপেক্ষমান গ্রাহকদের কপালে অশেষ দুঃখ লেখা ছিল সে আর না বললেই নয়।
আজ নামী এক বই-বিপনীর কাউন্টারে একজন কর্মীর মুখোমুখি হলাম। ভিড় ঠেলে কোনরকমে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেও, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলাম। নিজের দাদাকেও এতবার ডাকতে হয়নি, যতবার ওনাকে ডাকলাম, একবার চোখ ফিরে তাকাবার জন্য। তাকালেন বটে। কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কি করে পারেন কে জানে! বইয়ের একটা লিস্টি তার হাতে তুলে দেবার চেষ্টা করলাম। হাতে নিলেন না। আমি তুলে ধরে রইলাম, উনি দূর থেকে পড়ার চেষ্টা করতে থাকলেন। বইগুলো আছে কি নেই, জানানোর আগেই তিনি অন্য এক কাস্টমার দেখে তার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন। তার চাহিদা পূরণের আগেই আবার পিছন ফিরে কাকে কি একটা নির্দেশ দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলতে থাকার পর আবার ফিরে এলেন আমার দৃষ্টি-কোণে। এবার হাতে নিলেন বইয়ের তালিকাটি। কিছু না বলেই এবাউট টার্ন নিয়ে চলে গেলেন বিপনীর ভিতরে বইয়ের সন্ধানে। অনেক কাঠখর পুড়িয়ে পাঁচটি বইয়ের মধ্যে দুটো জুটল। অন্য গুলো পরে পাওয়া যাবে কি যাবে না সে উত্তর আদায় করতে পারলাম না। কাউন্টারের এপারে দাঁড়িয়ে যা পেয়েছি তাই যথেষ্ট ভেবে চলে আসলাম।
এরকম অভিজ্ঞতা ভুরি ভুরি আছে। "এখন হবে না পরে আসুন।" বা "এটা না আনলে তো ওটা হবে না" ইত্যাদি তো আমাদের শোনা কমন লাইন। বাকি গল্পগুলো পরে একদিন হবে।
(সঙ্গের ছবিটির সত্যি না মিথ্যে জানি না। তবে নেট-দুনিয়ার বহুল প্রকাশিত ছবি। এটা যদি সত্যিও হয়, অবাক হব না।)


