Sunday, 7 June 2015

সিরিয়াল বিভ্রাট


আচ্ছা এই ভুরিওয়ালা একটা ছেলেকে দেখে লোকের কী করে মনে হয় যে এ টিভি সিরিয়ালের অভিনেতা! কী বিপদ! সেদিন দুপুরবেলা। ছুটির দিন।  বেড়িয়েছি বাড়ি থেকে।  একটু এগোতেই আচমকা এক বয়স্ক ভদ্রলোকের গলা পেয়ে দাঁড়াতে হলো।  
"এই যে। এই তো পেয়েছি।  দাঁড়াও দাঁড়াও।"
আমি হতবাক।  এই ভর দুপুরে ছেলেধরার মত করে এই বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন কেন? আমাকেই বলছেন তো? পিছন ফিরে দেখেও নিলাম একবার।  না আর তো কেউ নেই।  
-- "তোমাকেই বলছি।  দাঁড়াও দাঁড়াও।  এই যে দেখছ।" এই বলে দেখি খানিকটা পিছনে এক বৃদ্ধাকে ডাকছেন।  বয়সের ভারে ভদ্রমহিলা একটু পিছনে পড়ে গেছেন।  আমি ভাবলাম, হয়ত কোনো ঠিকানা জানতে চাইবেন। এ পাড়ায়  আগে ওনাকে কখনো দেখিনি।  আমি বিনীত ভাবে বললাম, "হ্যা, বলুন।.."
-তুমিই তো সিরিয়াল কর।  তাই না? কি যেন চলছে এখন ষ্টার জলসায়। ...
 আমি তো থ! "না আমি নই।  আপনার বোধহয় ভুল হচ্ছে।  অন্য কাউকে ভাবছেন।" আমি স্মিত হেসে বলি।  এক  পা এগোই।  যাবার জন্য।  
---"না না বাবা।  আমি ঠিক চিনেছি।  ওগো দেখছ, এই সেই ছেলেটি না? কি যেন নাম সিরিয়ালটার।.." গিন্নিকে ডেকে চেনাবার চেষ্টা করেন আর চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকেন সিরিয়ালটার নাম।  
আমি আবার বলি, "আপনি অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন আমায়।"
এবার আরও বড় গোলা।  "আরে আমি জানি তোমরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে দিতে চাও না।  কিন্তু আমি ঠিক ধরেছি।  আরে কি আছে! আমরা তো বুড়ো-বুড়ি।  আমাদের কাছে আর কি আছে..."
ভদ্রমহিলাও আমাদের কাছে চলে এসেছেন।  চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছেন।  চশমার ভিতর থেকে দুটো চোখ আমাকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।  স্মৃতির সঙ্গে।  আমি বুঝতে পারছি বিপদ ঘনাচ্ছে।  আমি আবারও বাঁচার একটা চেষ্টা করি। ভাবি টিভিতে দেখে নিউজ চ্যানেলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। সচারচর অপরিচিত লোকজনকে কাজের প্রয়োজন ছাড়া নিজের আসল পরিচয় চট করে দিই না।  তাহলেই লোকে গুটিয়ে নেয় নিজেকে।  কিন্তু এখানে 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা'।
--"আমি সাংবাদিক।  আমি অভিনয় করি না। "
--"আরে আমাদের কাছে লুকোনোর কি আছে? তোমাদের অভিনয় আমাদের খুব ভালো লাগে। যাক গে, তা এখন কি শুটিং এ যাচ্ছ নাকি?"
ভদ্রলোকের ভাব জমানোর চেষ্টায় আমি তো প্রায় কুপোকাত।  এগোতেই পারছি না।  এগোতে দিচ্ছেনও না।  অভদ্রতাও করতে পারছি না।  যে বলব ধুর মশাই, পাগলামো থামান তো।  কার সঙ্গে কাকে মেলাতে চাইছেন! আমার মেলা কাজ আছে।  আমাকে ছাড়ুন।  
উনি বলে চলেছেন, " তা তুমি এদিকেই থাকো? নাকি এপাড়ায় কারো বাড়িতে এসেছিলে? আমাদের বাড়ি এ পাড়ায়।  ওই যে।"  হাত তুলে দেখালেন। 
 আমিও বললাম, "আমি এখানেই কাছে ভাড়া থাকি একটা ফ্ল্যাটে।"
--"তাই নাকি! ও বাবা আমি তো জানতামই না যে এ পাড়ায়  একজন অভিনেতা থাকে।  কয়েকজন হিরোইনকে অবশ্য আসতে দেখেছি ওই পাশের বিল্ডিং-এ।  আর তুমি এখানেই থাক।  আর আমি এতদিনেও জানি না।  কি কান্ড।"
আমার তখন কান্ড-জ্ঞান যেতে বসেছে।  আর ভুল ভাঙ্গানোর কোনো চেষ্টা করা বৃথা বুঝে কোনরকমে কেটে পড়ার তালে আছি।  কোনরকমে ব্যস্ততা দেখিয়ে বললাম, "আমার আসলে দেরী হয়ে যাচ্ছে।  আমি আসি।"
--"নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।  এস এস।  তোমার আবার শুটিং এর দেরী হয়ে যাচ্ছে।  তা কোথায় শুটিং আজ? টালিগঞ্জেই? তুমি তো এপাড়াতেই থাকো। একদিন এস আমাদের বাড়িতে।  আমরা বুড়ো-বুড়ি মিলে  থাকি।  তোমাদের সিরিয়াল দেখেই আমাদের সময় কেটে যায়।"
মনে মনে ভাবি, কি দরকার এসব পচা সিরিয়াল দেখার।  কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে এগোই।  ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাকে আবার আমার করুণ হাসি উপহার দিয়ে। 

.........

আমাকে আমার বন্ধুস্থানীয় এক পরিচালক একবার একটা সিরিয়াল এ অভিনয় করার সুযোগ দেবে বলেছিল।  সে নিজেও তখন সুযোগ খুঁজছিল।  সে যখন কয়েক বছর বাদে সুযোগ পেল, আমাকে বলল আমার চেহারায় নাকি আর সিরিয়াল হয় না।  আমি যে খুব জুলুজুলু নয়নে সিরিয়াল করব বলে অপেক্ষা করছিলাম, তা নয়।  কিন্তু চেহারার খোঁটায় একটু আহত তো হয়েইছিলাম।  যতই বিড়ম্বনায় পড়ি না কেন, পরে মনে মনে ভেবেছি আর হেসেছি যে, এই বৃদ্ধ দম্পতির আশীর্বাদে ক্ষতে একটু আরামের প্রলেপ লেগেছিল বৈ কি।  

(সঙ্গে ষ্টার জলসার আমার খুব প্রিয় একটি সিরিয়াল এর ছবি।  ছবি সৌজন্য: ষ্টার জলসা)

No comments:

Post a Comment