Wednesday, 11 March 2015

ঈক্ষণকাম


আমি সাইকেল চালাতে ভালোবাসি। আমার বাড়ি এক মফস্বল শহরে।  কলকাতা থেকে খুব দুরে নয়।  আমার খুব প্রিয় জায়গা  সেটা।  যদিও ফ্ল্যাট সংস্কৃতি হানা দিছে ধীরে ধীরে।  কিন্তু এখনো সেই পুরনো একতলা বা দোতলা একক বাড়িরই প্রাধান্য।  ছোট ছোট রাস্তা আর অনেক গাছপালা।  অনেক মাঠেই বাড়ি উঠে গেছে।  তবু কিছু খেলার মাঠ এখনো অবশিষ্ট আছে।  আমার সেই শহরের (যাকে এখনো লোকে গ্রাম বলে) অলি গলি দিয়ে সাইকেল চালাতে খুব ভালো লাগে।  যখন আমি স্কুলে-কলেজে  পড়তাম তখন সন্ধ্যেবেলায় মায়ের কাছে থেকে একটু ছুটি নিয়ে সেইসব রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে বেড়াতাম। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না।  আপন মনে এ গলি থেকে সে গলি ঘুরে বেড়াতাম।  গন্তব্য না থাকলেও একটা রুট ম্যাপ ছিল মনে মনে।  যে সব রাস্তা দিয়ে গেলে নিশ্চিন্তে যাওয়া যাবে।  বেশি গাড়িঘোড়া নেই, চড়া আলো নেই।  এমন রাস্তা দিয়েই আমি সাইকেল চালাতাম।  কখনো কখনো কুকুরের তাড়া  খাইনি তা নয়।  কিন্তু আলো -আঁধারী  রাস্তাই আমার বড় পছন্দের ছিল।  ওখানে অনেক বাড়ি।  আমাকে অনেকে চিনত।  কিন্তু বেশিরভাগ লোকজনই আমাকে চিনত না।  আমি চাইতামও না কেউ আমাকে চিনুক। কারণ সাইকেল চালানো আমার কাছে মেডিটেশন করার মত ছিল।  ওই সাইকেল চালানোর সময়েই মনের অনেক প্রশ্নের জবাব আমি নিজের কাছেই পেয়ে যেতাম।  অনর্গল কথা বলে চলতাম নিজের সঙ্গে।  সাইকেল প্যাডেলে চলত পা আর মন চলত এদিক থেকে ওদিক। এক সময়ে শান্ত হত। সন্ধ্যেবেলায় সাইকেল চালাতে চালাতে আমার অনেকের সঙ্গে পরিচিতি হয়ে গিয়েছিল। না,  বলা ভালো আমি পরিচিত হয়েছিলাম।  ওই বাড়িগুলোর মানুষজনের মুখ, কাজ কর্ম সব আমার জানা হয়ে গিয়েছিল।  ওদের আমার ভালো লাগত।  ওরা আমাকে না চিনলেও আমি ওদের চিনতাম।  একটা বাড়ির জানালার পাশে এক বৃদ্ধ বসে থাকতেন।  একদিন দেখালাম সেখানে একটা বিছানা।  বিছানায় শুয়ে সেই বৃদ্ধ, পাশে বসে এক মহিলা।  বুঝলাম বৃদ্ধ অসুস্থ।  অনেকদিন পর সাইকেল চালাতে গিয়ে দ্দেখলাম, ওই জানালা বন্ধ।  ওই বৃদ্ধকে আর দেখতে পাইনি। পরে বুঝে নিয়েছি তিনি আর নেই।  আমি সেই বৃদ্ধ কে চিনতাম না।  তাঁর নাম জানতাম না।  কিন্তু তিনি আমার পরিচিত ছিলেন।  বা ধরা যাক একটি বাড়ির এক দিদি।  দেখতাম ঘরে বসে খুব পড়াশোনা করত।  হয়ত ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। এটা আমার ধারণা ছিল। নিশ্চিত নই।  একদিন তার বিয়ে হয়ে গেল।  দেখলাম, আলো দিয়ে সাজানো বাড়ি।  কোনো বাড়ির দাদা চাকরি সুত্রে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন।  আমায় কেউ বলেনি।  আমি সাইকেল চালাতে চালাতে ওই বাড়ি সামনে দিয়ে যেতে যেতে কেমন করে যেন জেনে গেছি। এমন অনেক পরিচিত একে একে চলে গেছেন ওই এলাকা ছেড়ে।  অনেক বাচ্চাকে বড় হতে দেখেছি।  একতলা বাড়ি দোতলা হয়েছে।  এমন অনেক পরিবর্তন আমার সাইকেল থেকেই দেখা।  কোনদিন আমি দাঁড়িয়ে কথা বলিনি ওদের সঙ্গে।

এখন আমিও ওই মফস্বল শহর ছেড়ে বাসা বেঁধেছি মূল শহরে।  অনেকদিন কাজের চাপে অনেকটা সময় নিয়ে যাওয়া হয় না। যাওয়া হলেও সাইকেল নিয়ে বেরই না।  আলসেমি করি বা একটু হেঁটে আসি বাড়ির কাছাকাছি। সাইকেলটার যত্ন নেওয়া হয়না বিশেষ।  খুব সম্প্রতি একদিন একটু সাইকেল চালিয়ে আসলাম।  সত্যি কথা বলতে কি যেন প্রাণ ভরে শ্বাস নিলাম। শুদ্ধ হলো দেহ মন।  স্বাভাবিকভাবেই আমার 'পরিচিত'জনের মধ্যে অনেকেই নেই দেখলাম। একটি বাড়িতে একজন বয়স্ক মানুষ থাকতেন।  তাঁর স্ত্রী আর দুই মেয়ে।  মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল জানি।  সেই ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী সন্ধ্যেবেলায় একতলার ঘরে বসে টিভি দেখতেন।  আমার ওদের দেখতে ভালো লাগত।  আমি দুপাক ঘুরেও নিতাম সাইকেল করে ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে।  সেদিন দেখলাম বাড়ি তালা বন্ধ।

আজ  ফেসবুকের সৌজন্যে সেই দুই মেয়ের এক মেয়ের প্রোফাইল খুঁজে পেলাম।  সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ছবি দেখলাম অ্যালবাম জুড়ে।  কমেন্টস -এ দেখলাম লেখা "গত ৩০শে এপ্রিল মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন"। বাবার ছবির পাশে লেখা "কতদূর চলে গেছো"।  দেখে মনটা থেমে গেল।  একটা ঝটকা।  আমি ওনাদের সঙ্গে কখনো কথা বলিনি।  তবু মনে হলে আমার পরিচিতজন চলে গেছেন। আমি জানিও না।

মেয়েটি কাউকে লিখেছে, "আমার বাপের বাড়ির পালা সাঙ্গ হয়ে গেছে"।

এমন কত পরিচিত কথা আমার জানা নেই।  জানা হয়নি।  আজকাল সাইকেল চালাই না আমি।     

No comments:

Post a Comment