ছোটবেলায় বাবা মা'র সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিলাম। খুব ছোট ছিলাম তখন। কিন্তু এখনো মনে আছে একজন রবীন্দ্র ভবনের সামনের বাগানে বসে ছবি আঁকছিল। আমি পিছনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। বাগানের একটা ফুলের স্কেচ করছিল। এরকম অনেকেই এধার ওধার, বসে ছবি আঁকছিল। খোলা আকাশের নিচে বসে কাউকে ছবি আঁকতে আমার প্রথম দেখা। তারপর ওই আম্রকুন্জের কাছে গিয়ে ছেলেমেয়েরা গাছের নিচে বসে ক্লাস করছে, সেটাও আমার কাছে প্রথম দেখা। রবি ঠাকুরের বাড়িগুলো, ব্যবহার করা জিনিসপত্র, বই আর প্রচুর গাছপালা চারিদিকে - এসব একে একে দেখে একটা বই ' আমাদের শান্তিনিকেতন' কিনে আমরা বাড়ি ফিরেছিলাম। আর তারপর থেকে আমার শান্তিনিকেতনে থাকা আর পড়াশোনা করার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরী হয়েছিল। আমার মনে আছে বাবা আমার জন্য পাঠভবনের ফর্ম এনেছিল। কিন্তু নানা কারণে সে আর জমা দেওয়া হয়নি। আমারও আর শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করা হয়নি। মনে মনে সুপ্ত বাসনা ছিল যে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কোনো একটা বিষয় নিয়ে বিশ্বভারতীতে ভর্তি হব। সেটাও আর হয়নি।
কিন্তু শান্তিনিকেতনের প্রতি অমোঘ টান আমার বরাবর থেকে গেছে। বড় হওয়ার পরও সে টান এতটুকুও কমেনি। বরং সে টান রোমান্টিকতায় পরিণত হয়েছিল। তাই কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে যে বার আমরা বসন্ত উত্সবে গিয়েছিলাম, সেবার সবাই মিলে ঠিক করেছিলাম, আমরা টাকা একসঙ্গে করে একটা বাড়ি বানাবো বোলপুরে। আর ওটা আমাদের কমিউন হবে। থাকা, খাওয়া, গান-বাজনা, বই পড়া - সব হবে ওখানে। আমরা শান্তিনিকেতনের কোলে থাকব। যারা শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা তাদের একটু হিংসেও করতাম আমরা। আর শান্তিনিকেতনের যে সব বন্ধুরা পড়াশোনা করেছে, তাদেরও লুকিয়ে লুকিয়ে হিংসে করতাম। এখনো করি। ওখানে থাকা মানেই মনটা একদম অন্যরকম হয়ে যাওয়া। সৃজনশীলতার পরিচর্যা। অনেক পড়া, অনেক লেখা, অনেক গান, অনেক নাচ, অনেক ছবি আঁকা, অনেক ঘুরে বেড়ানো না-ছোঁয়া প্রকৃতির মাঝে। আবাসিক জীবনের প্রতি ঝোঁক থেকে জানি এই গুরু-শিষ্যের কাছাকাছি থাকার আত্মিক গুরুত্বটা কতটা। আমার এক পিসি আর এক কাকিমা শান্তিনিকেতনের ছাত্রী ছিলেন। ওদের থেকে টুকরো টুকরো গল্প শুনে শান্তিনিকেতন আমার কাছে একটা মিথের মত হয়ে উঠেছিল। ওখানে গেলেই আর আমার বন্ধুস্থানীয় দাদাদের সঙ্গে ওখানে গিয়ে কথা বললেই বা কিছু সময় কাটালেই জীবনটা কি সহজ লাগত। চুপচাপ বসে গাছপালার গন্ধ শুষে নিলেই যেন মন থেকে শব্দরা বেরিয়ে আসে। খোয়াইয়ে বসে বন্ধুদের আড্ডা। ক্যানেলের কাছে দাঁড়িয়ে পূর্নিমার চাঁদ। কোপাই নদীর ধারে শুয়ে গল্প। কলাভবনের গাছের নিচে বসে গান। ভালো মন্দের খাওয়া। ভুবনডাঙার মাঠের কোণে দাড়িয়ে আকাশ জোড়া কালো মেঘ। বাউল গান। অজানা সুন্দর মুখ। শান্তিনিকেতন জুড়ে অসংখ্য স্মৃতি জড়ো হয়েছে আমার।
যেই ক্যামেরা-মাইক নিয়ে সেন্ট্রাল অফিস-এর গেট এ ঢুকলাম, সব রোমান্টিকতা পিছনে। তখন আমি আদ্যপান্ত একজন প্রফেশনাল। খবর করতে এসেছি। কি সেই খবর? কলাভবনের এক ছাত্রীর যৌন হেনস্থার খবর। সেখানেই শেষ নয়। এই হেনস্থার খবর জেনেও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চুপচাপ বসে ছিলেন। ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। ছাত্রীটির বাবা অভিযোগ করেন যে উপাচার্য তাঁকে ঘুষ দিয়ে পুলিসে যেতে নিশেদ করেছিলেন। এসবের মধ্যে ছাত্রীটি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। মনের মধ্যে উপাচার্য আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের উপর একটা বিরক্তি। একটা রাগ। খবর চেপে রাখতে তো পারেননি। উল্টে কি বার্তা দিলেন বর্তমান আর ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের? এরকম গর্হিত অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এরকম অভিযোগ ভুরি ভুরি রয়েছে বর্তমান প্রশাসকদের বিরুদ্ধে। ঘন বুনো গাছপালা ঘেরা ইন্দিরা ভবনের ভিতর থেকে যেভাবে কড়া নিরাপত্তায় ছাত্রীটি ও তার বাবাকে বের করে নিয়ে গিয়ে, পুলিসে যেতে না দিয়ে, সযত্নে উত্তরবঙ্গের ট্রেন ধরিয়ে দেওয়া হলো, তা আমি অবাক হয়ে দেখলাম। এই ছাত্রীটি তো বোধহয় আর বিশ্বভারতীতে ফিরে আসবেন না। এই খবর দেখা ও ঘটনা পরম্পরা জানা অনেক অভিভাবক আর তাঁদের সন্তানদের শান্তিনিকেতনে পড়তে পাঠাবেন না। শান্তিনিকেতনে ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, যে স্বপ্ন আমি, আমার মত হাজারো গুণমুগ্ধরা এবং আরও অনেক ছাত্ররা, প্রাক্তনীরা দেখেছেন, কিভাবে কয়েকজন স্বেছাচারী, তাঁবেদার প্রশাসক ও শিক্ষকরা সেটা সযত্নে ভেঙ্গে দিচ্ছেন ধীরে ধীরে। লুঠতরাজ চালাচ্ছেন।
No comments:
Post a Comment