সহজ কথায় চালে ডালে। সুস্বাদু থেকে সুস্বাদুতর করার জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর রেসিপি নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সহজ হোক বা কঠিন, আমার কাছে ব্যাপারটা সুস্বাদুতমই। স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এ খাদ্যবস্তুর গ্রহণযোগ্যতা আমার কাছে প্রশ্নাতীত। সুতরাং লক্ষী পুজো বা সরস্বতী, মনসা বা গনেশ, শনি বা লোকনাথ, ধর্ম কর্মে মন না থাকলেও, পাত পাড়তে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। শুধুমাত্র ভোগের মেনুতে খিচুড়ি থাকলেই এ বান্দা হাজির। খিচুড়ি জিন্দাবাদ।
পুজোর ভোগের নেমন্তন্ন থেকে যে আমার খিচুড়ি প্রীতি জন্মেছে, এমনটা নয়। বঙ্গ গৃহস্থের ঘরে বর্ষা বা বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাদল বরষে তো খিচুড়ি পাতে। অন্ততঃ ছোটবেলা থেকে বৃষ্টি হলেই মা'র কাছে খিচুড়ির বায়না ছিল অবধারিত। তারপর, আলু ফুলকপি সহযোগে, ঘি, বেগুন ভাজা, ডিম ভাজা, পাঁপড় আর ভাগ্য ভালো থাকলে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে জমিয়ে ঘন খিচুড়ি। আহা! শীতকালের রাত্রিরেও খিচুড়িরব্যাপারটা থেকে ভালো মেনু আর কিছু ছিল না। মা আবার মশলাপাতি না থাকলে, ঠিক ডাল না থাকলে, খিচুড়ি রান্না করতে চাইত না। কিন্তু তখন মনে হত মশলাপাতি কি দরকার! চালে ডালেই তো খিচুড়ি হয়ে যায়। নিজে কখনও রাঁধিনি, তাই রাঁধুনির চোখ দিয়ে কখনও খিচুড়ির কথা ভাবিনি। আমার সবই চলে। এখনও চলে।
বাসি খিচুডির স্বাদ অনবদ্য। তাই শুধু রাতে নয়, কিছুটা রেখে সকালবেলা ব্রেকফাস্ট খিচুড়ি দিয়ে সেরে নেয়ার বন্দোবস্ত করে রাখা হত। ব্রেকফাস্ট এ খিচুড়ি! শুনে অনেকেই নাক সিঁটকোতেন। বিশেষ করে আমার নরেন্দ্রপুরের অনেক বন্ধুই। কিন্তু শুক্রবার রাতে ভবনের খাবারের মত রবিবার সকালের জলখাবারের দিকেও আমার মন পড়ে থাকত। কে শুরু করেছিলেন ঠিক জানি না। যাঁরাই করে থাকুন তাঁদের আমার অন্তরের ধন্যবাদ। ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টায় রবিবার সকালের মেনু ছিল খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজা। অমৃতের মত তারিয়ে তাড়িয়ে খেতাম। অনেকেই খেত না বলে বোধহয় ভাগেও বেশি পেতাম। বাসি আর নরেন্দ্রপুরের খিচুড়ি আমার বড় প্রিয়। তবে পুজোর ভোগের মত খিচুড়ির স্বাদ আর বোধহয় কিছুতেই নেই। লক্ষী পুজোর নেমন্তন্ন পাওয়ার জন্য ছটফট করতাম। শুধু ওই ভোগের খিচুড়ি খাব বলে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা পূর্ববঙ্গীয় মানুষেরা খিচুড়ি ভোগ ভালো রাঁধেন। বেশ জমাট বাঁধা। সঙ্গে লাবড়ার সঙ্গত। লিখতে লিখতেই জিভে জল চলে আসছে। মা লক্ষী আমাকে নিজগুনে ক্ষমা করে ঠিক খিচুড়ি জুটিয়ে দেন ফি বছর।
তবে অনেক পরে জেনেছি, পেটের পক্ষে খিচুড়ি পথ্য হিসেবে কাজ করে। ফাইভ ষ্টার হোটেলে বসে দেশের এক বড় রাজনীতিককে দই দিয়ে খিচুড়ি খেতে দেখে বেশ অবাকই হয়ে ছিলাম। তবে শরীর সুস্থ থাকবে এই অছিলায় আমিও আজকাল নিয়মিত খিচুড়ি খাই। "করতে গেলাম ভাত আর হয়ে গেল খিচুড়ি" - এই গল্পও আমাকে ফুটপাথের খিচুড়ি খাওয়া থেকে থামাতে পারে নি। (এক বিধবা মহিলা গঙ্গা স্নান করে এক ঘটি গঙ্গা জল নিয়ে এসে একটু চাল দিয়ে সেই ঘটিতেই ভাত বসিয়েছিলেন। ওমা। যখন ভাত নামাতে যাবেন, দেখেন একি এতো হলুদ খিচুড়ি হয়েছে! পরে বুঝেছিলেন, গঙ্গা জল তোলার সময় জলের সঙ্গে মনুষ্য বিষ্ঠাও তুলে এনেছিলেন। তাই ভাত হলো খিচুড়ি )
দিন দিন আমার খিচুড়ি-পাগলামো যেন বেড়েই চলেছে। যেখানে পাই সেখানেই খাই। আত্মীয়-স্বজনরাও জেনে গেছে। গেলেই খিচুড়ির লোভ দেখিয়ে আটকে দেয়। কাজের ব্যস্ততায় পুজোর নেমন্তন্ন রক্ষা না করতে পারলেও, বাড়ি বয়ে খিচুড়ি ভোগ দিয়ে যায়। খিচুড়ি রান্না হলে আগাম নিমন্ত্রণ চলে আসে। আর আমিও তেমন। রাত বারোটায় একবার এক শনি মন্দিরের সামনে হাজির হয়েছিলাম। খবর ছিল, ভোগ বিতরণ হচ্ছে। একসময় যে খাবার বিলাসিতার জন্য রসিয়ে বানাত মা, আজকাল আমরা নবীন দম্পতি তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর থাকলে বা বাড়িতে কোনো খাবার না থাকলে একটু চালে ডালে বসিয়ে নিয়ে থাকি।
একবারই আমি খিচুড়ি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম। হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, "আমাদের এখানে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আপনারা চলে আসুন।" উঁকি মেরে দেখে নিয়েছিলাম, খাওয়া মানে খিচুড়ি। প্রচুর বাচ্চা, মহিলা, পুরুষদের সঙ্গে আমিও হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেই ঘোষণাস্থলের উদ্দ্যেশে। অন্যদের হাতে বাটি, থালা, পেটে খুব খিদে, চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যত। পাকা রাস্তার দুধারে খোলা আকাশের নিচে শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে ওদের অবস্থান। আর দূর দুরান্তে যেদিকে চোখ যায়, শুধু জল আর জল। টালির বাড়ির মাথাটুকু দেখা যাচ্ছে বা নারকেল গাছের আগা। পাকা রাস্তা থেকে আজ সকালেই জল নেমেছে। সেখানেই উঠে এসেছে বন্যা বিধ্বস্ত আর্তনাদ। কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একটু খিচুড়ি রান্না করে কোনরকমে পেটে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমি শহুরে সাংবাদিক। বন্যা কভার করতে গিয়ে ভাবছি দুমুঠো যদি আমারও জোটে। আসলে হাঁটছি খিচুড়ির লোভেই। আচমকা হাতে টান। আমার ভিডিও জার্নালিস্ট সুরজ। "এটা ত্রানের খিচুড়ি। এটা ছেড়ে দে। একটু পরেই তো আমরা বেরিয়ে যাব। এদের খাবার পাওয়াটা অনেক জরুরি।" যেন তাল ফিরে পেলাম। আত্ম সংযমী হলাম। খিচুড়ির দিকে পিছন ফিরে হাঁটা লাগলাম।
সেই সংযমের পুরস্কার হিসেবে হয়ত আজও নিয়মিত খিচুড়ি জুটে যায়। এখানে সেখানে।
Mysuru Casino - The HERZAMMAN
ReplyDeleteMysuru Casino - The Home 바카라 사이트 of the Best of the Slots! Visit us to 출장안마 Play worrione.com the best slots and enjoy the best table games 토토 사이트 in our casino. jancasino.com Visit us